ভ্রমন কাহিনী

অদেখা বাংলার রূপ টাঙ্গুয়ার হাওর

টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরণা) এসে মিশেছে এই হাওরে।

দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ৯,৭২৭ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি।২০০০ খ্রিস্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার স্থান’ (Ramsar site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা —রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়।

মে ১৪, ২০১৭ তারিখ টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে ফিরলাম। টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরার উৎকৃষ্ট সময় জুন থেকে অক্টোবর মাস। সাধারনত ৪-৫ মাস পানি থাকে প্রথম মাসে যাওয়ার পরই পানি পরিষ্কার হয়ে যায় তাই পানি আসার এক মাস পর যাওয়া ই উত্তম।

ট্যুর প্ল্যানঃ

রাতের ১০-১১ টার বাসে করে ঢাকা থেকে সুনামগন্জ যাত্রা করুন। তারপর দিন সকালে বাস থেকে নেমে ৭ টার মধ্যে নাস্তা করে তাহিরপুর চলে যান সিএনজি নিয়ে, যেতে ১ ঘন্টা লাগবে। তাহিরপুর পৌছে বাজার করে নৌকা ঠিক করে নৌকায় উঠে পরুন। ৯/১০ টার মধ্যেই নৌকা ছাড়ুন। এর পর সারাদিন হাওরে ঘোরাফেরা, গোসল এবং দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে বিকেলে টেকেরঘাটের দিকে চলে যান। রাতে কোন একটা বাজার / গ্রামে নৌকা থামিয়ে নৌকাতেই রাত্রি যাপন করতে পারেন অথবা, টেকের ঘাটেই রাত্রি যাপন করে অনেকে। (কাপলদের জন্য “হাওর বিলাস” গ্রাম্য কটেজ আছে থাকার জন্য)।

রাতে থেকে পরদিন সকালে বারিক্কার টিলার উদ্দেশ্য যাত্রা করুন। বারিক্কার টিলা, যাদুকাটা নদীতে সারাদিন ঘুরাঘুরি করে দুপুরে চলে যান তাহিরপুরের নতুন আকর্ষণ লালঘাট ঝর্ণা। তারপর বিকালে তাহিরপুরের উদ্দেশ্য যাত্রা করেন। টার্গেট থাকবে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে সুনামগঞ্জ পৌঁছানো। সুনামগঞ্জ কুটুম বাড়ি হোটেলের পরিবেশ অনেক ভালো এখানে রাতের খাবার সেরে রাত দশটায় ঢাকার বাসে রওনা দিন।

কিভাবে যাবেন? 

মহাখালী থেকে এনা , সায়দাবাদ থেকে শ্যামলী , হানিফ ও ইউনিক পরিবহনের সুনামগঞ্জ- ঢাকা নাইটকোচ রাত ১০ টা থেকে ১১ঃ৩০ পর্যন্ত ঢাকা থেকে ছেড়ে যায়। ভাড়া শ্রেনীভেদে ৪৭০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা ।

নামবেন সুনামগঞ্জ নতুন বাস্ট্যান্ড ব্রীজের গোড়ায়। ব্রীজের গোড়া থেকে সি এন জি এবং ব্রীজের উপর থেকে মোটর সাইকেল/ লেগুনা যোগে তাহিরপুর।ভাড়া সি এন জি ও মোটর সাইকেলে জনপ্রতি ১০০ টাকা এবং লেগুনায় ৮০ টাকা।

তাহিরপুর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকের ঘাট , বারেকের টিলা , যাদুকাটা নদী এসব দেখতে বর্ষায় নৌকা এবং শুকনো মৌসুমে হাঁটা / মোটর সাইকেল। তাহিরপুর বাজার নদী ঘাটেই সচরাচর নৌকা পাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন? 

টাঙ্গুয়ার হাওরে থাকার তেমন কোন সুব্যবস্থা নাই। বর্ষায় নৌকায় এবং শুকনো মৌসুমে তাবু। হাওরে রাত্রিযাপন নিরাপদ যদি আবহাওয়া অনুকুলে থাকে। তবে পুরো হাওর অঞ্চল জুড়েই পেয়িং গেস্টের প্রচলন আছে। পছন্দসই খুজে নিতে হয়। নিজেদের বাংলোঘরে এমন দু চারজন পেইং গেস্ট অনেকেই সংসারের বাড়তি ইনকাম সোর্স হিসেবে করে থাকে। এছাড়া, হাওর বিলাশ নামে একটি কাঠের বাড়ি আছে যারা সল্প মূল্যে রুম ভাড়া দিয়ে থাকে টেকেরঘাট এলাকায়। এখানে থাকতে যোগাযোগ করতে পারেন খসরু ভাই এর সাথে 01735464481 এই নাম্বারে। আর যদি তাবুতে থাকাতে চান সেই ব্যবস্থা ও আছে 01748972158 (সোহাগ)

নৌকা/ মোটর সাইকেল ভাড়া

তাহিরপুর থেকে টেকেরঘাট লাইনের ট্রলার ( যাত্রীবাহী ট্রলার ) এর ভাড়া ৪০ টাকা। অনেকটা লোকাল বাস কোয়ালিটি ট্রলার। প্রতিটা গ্রামে যাত্রী উঠা নামা করেই টেকেরঘাট পৌঁছাবে। নিজেই পুরো নৌকা নিতে চাইলে আপনাকে ঘাটে মাঝিদের সাথে দরকষাকষি করে নিতে হবে।

ছোট ছাদ ছাড়া ট্রলার – ৪/৫ জন ১৫০০-২০০০ টাকা দৈনিক।
ছোট ছাদ সহ ট্রলার – ১০/১৫ জন ২৫০০- ৩০০০ টাকা দৈনিক ।
বড় ট্রলার – ৩০ জন ৪৫০০- ৫৫০০ টাকা দৈনিক।

নৌকার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন পরাণ মাঝি 01718168314 এই নাম্বারে। দাম দর করে নিবেন আগে।

খাবো কি? 

মাছ পাথর ধান- সুনামগঞ্জের প্রাণ। সুনামগঞ্জ যাবেন তাও আবার টাঙ্গুয়ার হাওর যাবেন , মাছ ছাড়া খাবেন কি ? হাওরের ফ্রেস ও সস্থা মাছ।প্রায় ৩০ প্রজাতির মিঠা পানির সুস্বাদু মাছ খাবেন। ঘনিয়া, ঘুইঙ্গা, পাবদা, কাল বাউস ও রিটা উল্লেখ যোগ্য।

হাওরে বিভিন্ন পদের চাল পাবেন । বোরো লাল চালের ভাত, আতপ চালের লালচে ভাত ও বিরুণ চালের আঠালো ভাত বিখ্যাত। হাওরের পানি ও কলা সুস্বাদু। শীতে পাখি ও বর্ষায় হাঁস হাওরে আপনার সেরা পছন্দ হতে পারে। নৌকার উঠার আগে তাহিরপুর বাজার থেকে ২ দিনের সব বাজার করে নিবেন। আর, মাছ না পেলে হাওরে মাছ ধরা নৌকা পাবেন এবং আরো অনেক বাজার পাবেন অন্য বাজার থেকে তাজা মাছ কিনে নিতে পারেন।

 

খরচ কেমন?

টোটাল খরচ ব্রেক ডাউন করলে (১ রাত থাকা নৌকায়) আসবে বাস ভাড়া যাওয়া আসা ১০০০ টাকার মতো। তারপর সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুর ১০০ টাকা সিএনজি ভাড়া পার হেড। নৌকা ভাড়া ২ দিন এক রাতের জন্য কমপক্ষে ১০ জনের দলের জন্য পার হেড ৮০০ টাকার মতো সর্বোচ্চ। এর মধ্যে বাবুর্চি খরচ অন্তর্ভুক্ত। ভালো খাবার খেলে পার হেড লাঞ্চ ২০০ টাকা ধরলাম, তাহলে ২ দিনে ৮০০ টাকা লাঞ্চ এবং ডিনার। নাস্তা সকাল বিকালের সহ ২০০ টাকা। টোটাল খাবার খরচ ১০০০ টাকা। আর টুকটাক খরচ মিলিয়ে ২০০-৩০০ টাকা যেতে পারে। ৩২০০ থেকে ৩৫০০ টাকায় ১০ জনের দল আরামে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে আসতে পারবেন।

আবহাওয়া

হাওরে ভ্রমনের সবচেয়ে বড় প্রতিকূলতা হতে পারে আবহাওয়া। শীতে তীব্র শীত , গরমে অসহনীয় গরম ও বর্ষায় একটানা দীর্ঘ দিন বৃষ্টি আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই যাওয়ার আগে হাওরের আবহাওয়া সম্পর্কে খোজ খবর নিয়ে যাওয়া এবং সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া ভালো।

গ্রুপ ট্যুরে যেতে চাইলে? 

ছুটি ট্রাভেলস গ্রুপ সময় এবং সিজন অনুযায়ী গ্রুপ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে। সাজেক, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, হাওর, রাঙ্গামাটি, ঝর্ণা ট্যুর, বিভিন্ন ধরনের ডে ট্যুর, রিসোর্ট ট্যুর এবং আরো অনেক রকমের ইভেন্ট হয় সারা মাস এবং সারা বছর। আমাদের গ্রুপে জয়েন করলে আমাদের সব আপডেট এবং ইভেন্ট লিস্ট দেখতে পারবেন। যেহেতু গ্রুপ ট্যুর হয় তাই খরচ হবে সবচেয়ে কম এবং আপনাকে টিকেট / খাবার / লোকেশন / স্পট / ট্রান্সপোর্টেশন ইত্যাদি কোন কিছু নিয়েই টেনশন করতে হবে না। আমাদের আগের সব ট্যুরের এলবাম দেখতে চাইলে ভিজিট করতে পারেন আমাদের ছুটি ট্রাভেলস গ্রুপের ফেসবুক পেজ

মন্তব্য করতে ভুলবেন না
TAGS
মেহেদী হাসান
ঢাকা, বাংলাদেশ

হ্যা, এটাই আমি মেহেদী! এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা আমি একজন শখের ট্রাভেলার। পেশায় সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার। আমার জীবনের ষোল আনাই শখ। যেমন, সব ধরনের শখের মতো এই ব্লগটিও শখের। এটি আমার যাযাবর জীবনের ডায়েরী!