সন্দ্বীপ ভ্রমণ, ক্যাম্পিং, খাওয়া ও ঘুরা

26 Dec

সন্দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত উপজেলা। দ্বীপটি মূলত মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত। চট্টগ্রাম উপকূল ও সন্দ্বীপের মাঝখানে সন্দ্বীপ চ্যানেল অবস্থিত। চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে নদীপথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এ উপজেলার অবস্থান। সন্দ্বীপ থেকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলের দূরত্ব প্রায় দশ মাইল। নোয়াখালীর মূল ভূখন্ড সন্দ্বীপ থেকে প্রায় ১২ মাইল পশ্চিমে অবস্থিত। সন্দ্বীপের প্রায় বিশ মাইল পশ্চিমে হাতিয়া দ্বীপের অবস্থান। সন্দ্বীপের সীমানা হচ্ছে পূর্বে সন্দ্বীপ চ্যানেল ও চ্যানেলের পূর্ব পাড়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা ও মীরসরাই উপজেলা, উত্তরে বামনী নদী, পশ্চিমে মেঘনা নদী ও তারও পশ্চিমে নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

এটি বাংলাদেশের অত্যন্ত প্রাচীন একটি দ্বীপ। ইউরোপীয়দের লেখা ইতিহাসে জানা যায় যে সন্দ্বীপে প্রায় তিন হাজার বছরের অধিককাল ধরে লোক বসতি বিদ্যমান। এমনকি এককালে এর সাথে সংযুক্ত থাকা নোয়াখালীতে মানুষের বসতি স্থাপনের পূর্বেই সন্দ্বীপে জনবসতি গড়ে উঠেছিল। সন্দ্বীপের লবণ শিল্প, জাহাজ নির্মাণ কারখানা ও বস্ত্র শিল্প পৃথিবী খ্যাত ছিল। উপমহাদেশের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভ্রমণকারীরা এই অঞ্চলে এসে তাদের জাহাজ নোঙ্গর করতেন এবং সহজ বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধাদি থাকায় এই অঞ্চলে ব্যবসা এবং বসতি স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। ১৭৭৬ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি বছর সন্দ্বীপে উৎপাদিত প্রায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজার মণ লবণ, তিনশ জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হত। সন্দ্বীপ এককালে কম খরচে মজবুত ও সুন্দর জাহাজ নির্মানের জন্য পৃথিবী খ্যাত ছিল।

অনেক ইতিহাস হলো এবার আসুন সন্দ্বীপ ভ্রমণের বিস্তারিত খুটিনাটি দেখে নেই। অপরুপ এই দ্বীপটি যেমন প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর তেমনি এর মানুষ গুলোও অন্ত্যন্ত সহজ সরল। সন্দ্বীপ বিচ ধরে ঘাসের গালিচায় দীর্ঘ পথ হেটে বেড়াতে পারবেন আর হ্যা আপনার মনেই হবে না যে বাংলাদেশের কোথাও ঘুরছি আমি।

কুমিরা ঘাট যেখান থেকে স্পীডবোট, সী-ট্রাকে করে স্বন্দীপ যেতে হয়

ট্যুর প্ল্যানঃ  সন্দ্বীপ ভ্রমণের উপযুক্ত সময় শীতকাল। মোটামুটি অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত এই সময়ে গেলে সমুদ্র শান্ত থাকে তাই নির্ভয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। আর ক্যাম্পিং করতে চাইলে শীতকাল বরাবর ই উত্তম।সন্দ্বীপ ১ রাত থাকার প্ল্যান করতে পারেন চাইলে ২ রাতের প্ল্যান ও করতে পারেন। আমরা ১ রাতের প্ল্যান করে গিয়েছিলাম এবং বেশ ভালো ভাবেই ঘুরে এসেছি।

স্পীডবোট পাইনি তাই সী-ট্রাক / ট্রলারে করে রওনা দিলাম আমরা

১ রাতের ট্যুর প্ল্যান করে আমরা রাতের বাসের করে চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। সকালে কুমিরা নেমে অটো নিয়ে ঘাটে  যাই। তারপর ট্রলারে করে সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ঘাটে যাই ৩ঘন্টার মধ্যে। সন্দ্বীপ পৌছে চলে যাই টাউনকমপ্লেক্স। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে পশ্চিম পাড়ে  গিয়ে স্থানীয় এক ভাইয়ের সাহায্য নিয়ে তাবু পিচ করি। আর, টয়লেট পাবেন মসজিদের, বাজারের, কবরস্থানের এখানে। কারো সাহায্য নিয়ে লাকড়ি কিনে ফেলেন এক মন। ক্যাম্পসাইটে পৌছে দিয়ে যাবে। তবে ১ মন লাকড়ি ১৫০০ টাকার মতো লাগতে পারে। কেরোসিন নিতে ভুলবেন না। রাতের পশ্চিম পাড় বাজারেই খাওয়া দাওয়া করি আমরা। সারারাত আড্ডা মেরে, ক্যাম্পফায়ারে আলু পুরিয়ে খেয়ে সকালে উঠে নাস্তা করে রওনা দেই ঘাটের উদ্দেশ্যে। তারপর স্পীডবোটে বাশবাড়িয়া ঘাট। সেখান থেকে সীতাকুন্ড বাজার তারপর দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে করে ঢাকা।

আমাদের ক্যাম্পসাইট, সন্দ্বীপ পশ্চিমপাড়ে

কিভাবে যাবেন?

সন্দ্বীপ অনেক ভাবেই যাওয়া যায়। আমি জনপ্রিয় উপায়গুলো বলছি। প্রথমেই বাস, ঢাকা থেকে চট্রগ্রামগামি বাসের টিকেট করে উঠে পরুন। নামবেন সীতাকুন্ডের কুমিরা। এখান থেকে অটো নিয়ে চলে যান ট্রলার ঘাট / স্টিমার ঘাট। এখান থেকে সিরিয়ালের টিকেট করে স্পীডবোটে চলে যেতে পারবেন সন্দ্বীপ। ভাড়া জনপ্রতি ৩০০ টাকা। এছাড়া ট্রলার আছে যেগুলোকে সি-ট্রাক বলে। সি-ট্রাকে করেও যেতে পারেন ভাড়া পরবে ১৫০ টাকার মতো জনপ্রতি। এতে সময় লাগবে ২-৩ ঘন্টা। স্পীডবোটে আধাঘন্টার একটু বেশি।

বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ

ঢাকা বাদে চট্রগ্রাম থেকে যারা যেতে চান তারা চট্রগ্রাম সদরঘাট থেকে যেতে পারেন। এমভি বারো আউলিয়া,এমভি মতিন নামে দুটি জাহাজ রোটেশন পদ্ধতিতে চলে সারাবছর। প্রতিদিন সকাল ৯ টায় (শনিবার, সোমবার, বুধবার, বৃহস্পতিবার) সদরঘাট ছেড়ে যায় জাহাজ।

সন্দ্বীপ পৌছানুর পর আপনাকে যেতে হবে টাউনকমপ্লেক্সে। এখানে থাকার হোটেল পাবেন। সবসময় কম বেশি খালি ই থাকে তাই অগ্রীম বুকিং এর প্রয়োজন নেই। আর যদি ক্যাম্প করতে চান তাহলে চলে যেতে হবে রহমতপুর (সন্দ্বীপ পশ্চিম পার)। সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া থেকে ২৫০টাকার মতো নিবে সিএনজি রিজার্ভ।

এমন সন্ধ্যা জীবনে একটিই আসে বলে মনে হয়

কোথায় কোথায় ঘুরবেন?

উত্তরের সবুজ চর
কুমিরা ঘাটের জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প
সন্দ্বীপে মরিয়ম বিবি সাহেবানী মসজিদ
পশ্চিম পাড়ের বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশ (ক্যাম্পসাইট)

কোথায় খাবেন? কি খাবেন? 

দক্ষিণ সন্দ্বীপের শিবের হাটে বিনাশার দোকানের মিষ্টি।
শীতকালে খেজুর রস / রসের সিন্নি / পিঠা
খাবার হোটেলে মুরগী / গরু ইত্যাদি খাবার (টেস্ট ভালো)

সারারাত তুমুল আড্ডা আর ক্যাম্পফায়ারে আলু পুড়িয়ে খাওয়া ছিলো অসাধারন

থাকার হোটেল আছে কি?

অবশ্যই থাকার হোটেল আছে তবে বিশাল বহুল কিছু না। রাতের মাথা গোজার ঠাই এর মতো। খরচ ও নামে মাত্র। এনাম নাহারে থাকার কয়েকটি হোটেল আছে সেখান থাকতে পারেন। এছাড়া সেনেরহাট এলাকায় ভালো একটি হোটেল আছে সেখানে থাকতে পারেন।  উপজেলা পরিষদ থেকে অনুমতি নিয়ে সরকারি ডাক বাংলোতে থাকতে পারেন (মাহমুদুর রহমান ০১৮১১৩৪১৭২২)।

খরচাপাতিঃ

ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম বাস ভাড়া ৫০০ টাকা।
সীতাকুন্ড থেকে ঢাকা ফেরার বাস ভাড়া ৪০০ টাকা
সীতাকুন্ড কুমিরা থেকে ঘাটে যেতে ১৫ টাকা অটো ভাড়া
স্পীড বোট ভাড়া ৩০০ টাকা * ২ = ৬০০ টাকা
গুপ্তছড়া থেকে পশ্চিম পাড় ৫০টাকা*২= ১০০ টাকা জনপ্রতি
খাওয়া ২টা নাস্তা দুপুরের খাবার ২ বার, রাতের ১ বার = ৫০০ টাকা
তাবুর ভাড়া নিলে তাবুর খরচ, নিজের থাকলে ভালো অথবা হোটেলের খরচ = ৫০০ টাকা
সবমিলিয়ে ৩০০০ টাকার মধ্যে সুন্দর ট্যুর হয়ে যাবে।

ভ্রমণ টিপসঃ

১/ কোথাও সময় নষ্ট করবেন না। সন্ধ্যার ঘন্টাখানেক আগে ক্যাম্পসাইট পছন্দ করে তাবু পিচ করে ফেলুন।
২/ স্থানীয় কোন মুরব্বীর সহায়তা নিয়ে একটা ছেলেকে নিতে পারেন যে সব সময় এমনকি রাতেও ক্যাম্পসাইটে আপনাদের সাথে থাকবে। তাকে ৫০০ টাকা দিয়ে দিলেন টিপস হিসেবে। এতে যেমন সহজে সব খুজে পাবেন, খেতে পারবেন, ঘুরতে পারবেন রাতে নিরাপত্তায় ও সে স্থানীয় কেউ এলে সে কথা বলতে পারবে।
৩/ খেজুর রস / খোলাজা পিঠা / ঝোলা গুড় ইত্যাদি খাবার শীতকালে পাওয়া যায়। পেলে অবশ্যই খাবেন।
৪/ সাইকেল পেলে ভাড়া নিয়ে পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারেন। দারুন মজা পাবেন।


ভ্রমন সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্ন / তথ্য / ট্যুর প্ল্যানের জন্য আমাদের ফেসবুক গ্রুপ ছুটি ট্রাভেল গ্রুপে জয়েন করতে পারেন। ছুটির সব মেম্বার খুবই হেল্পফুল, সুন্দর একটি ট্যুরের জন্য সকল হেল্প এখানে পাবেন। এছাড়া আমি ছুটির সাথে প্রতিমাসেই ট্যুর দিয়ে থাকি চাইলে ছুটির ইভেন্টেও জয়েন করতে পারেন। ছুটি একটি ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি ট্রাভেল গ্রুপ তাই নিশ্চিন্তে যেতে পারেন দেশের যেকোন প্রান্তে। 

ফেসবুক গ্রুপ – ছুটি ট্রাভেল গ্রুপ (https://fb.com/groups/ChutiTravelGroup)

2 Replies to “সন্দ্বীপ ভ্রমণ, ক্যাম্পিং, খাওয়া ও ঘুরা

মন্তব্যসমূহ / আলোচনা