ভ্রমন কাহিনী

সাজেক ভ্রমনের পরিপূর্ণ গাইডলাইন

সাজেক ভ্যালি রাঙ্গামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। সাজেক হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন । যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল । সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা , দক্ষিনে রাঙামাটির লংগদু , পূর্বে ভারতের মিজোরাম , পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা। সাজেক রাঙামাটি জেলায় অবস্থিত হলেও এর যাতায়াত সুবিধা খাগড়াছড়ি থেকে।

সাজেক সারাবছর ই যাওয়া যায়। আর সাজেকে পাহাড়ধস বা, রাস্তা ধস এরকম কোন ঝুকি নেই। তাই নিশ্চিতেই সাজেক যেতে পারেন। বর্ষায় সাজেকের রুপ যেনো শতগুনে বেড়ে যায়। পাহাড়ের কোলে মেঘের খেলা চলে রাত ভর। সারাক্ষনই পাহাড় আর মেঘের মিতালি। আর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, ষোল কলা পূর্ণ। হাজারফুট উচুতে উঠে যখন মেঘের মাঝে হারিয়ে যাবেন মনে হবে অন্য এক পৃথিবী। সাজেকে সূর্য উদয় এবং সূর্যাস্তের কোন তুলনা হয় না। হারিয়ে যাবেন অন্য রকম এক প্রশান্তিতে। 

জুলাই মাসেই যাযাবর এক্সপ্রেস এর ৩০ জন ট্রাভেলার নিয়ে ঘুরে আসলাম সাজেক এবং খাগড়াছড়ি তাই অন্যরা যদি নিজেরা নিজেরা যেতে চায় কিভাবে যেতে পারবে তার বিস্তারিত একটু লিখে ফেলার প্রয়োজন মনে করলাম।

ট্যুর প্ল্যানঃ 

রাতের গাড়িতে করে (শ্যামলি, হিমাচল, শান্তি পরিবহন) খাগড়াছড়ি চলে যান। আগেই চান্দের গাড়ির সাথে যোগাযোগ করে বুকিং দিয়ে রাখবেন তারা আপনাকে সকালে বাসস্ট্যান্ড থেকে রিসিভ করবে। তারপর নাস্তা করে ৭/৩০ বা ৮ টার মধ্যে রওনা দিয়ে ৯ টার মধ্যে চলে যান দিঘীনালা তারপর হাজাছড়া ঝর্ণা। সেখানে ১ ঘন্টা গোসল করে আর্মির এসকর্ট ধরুন ১০ টা ৩০ মিনিটের মধ্যে কারন এর পরে গেলে আর্মির এসকর্টের সাথে যেতে পারবেন না। তখন আবার বিকেলে যেতে হবে, সাজেক যাওয়াটাই বৃথা হয়ে যাবে।

হাজাছড়া ঝর্ণা

আর্মি এসকর্ট নাম এবং সিগনেচার দিয়ে রওনা হয়ে যান। উচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা বন জংগল দেখতে দেখতে ১২/১ টার মধ্যে পৌছে যাবেন সাজেক। আগে থেকে বুকিং করা কটেজে চলে যান সোজা। তারপর রেস্ট নিন, লাঞ্চ করুন। বিকেলের দিকে হ্যালিপ্যাড, স্টোন গার্ডেন, আশে পাশের পাড়া বেড়িয়ে আসুন, ছবি তুলতে চাইলে ছবি তুলুন কারন ছবি তোলার আর সুযোগ হবে না।

রুইলুই পাড়া

সন্ধ্যার পরে বার বি কিউ করতে পারেন। কটেজের লোককে বললেই তারাই সব ম্যানেজ করে দিবে। যদি ছোট গ্রুপ হয় তাহলে রুইলুই পাড়ায় গির্জার সামনে প্রতিরাতেই বার বি কিউ করে সেখান থেকে অর্ডার দিয়ে খেতে পারেন। আর, রাত ২/৩ টায় একবার বেড়িয়ে রুইলুই পাড়ার রাস্তায় হাটাহাটি করতে পারেন। পূণিমা থাকলে আর মেঘ থাকলে অসাধারন এক অভিজ্ঞতা হবে।

রুইলুই পাড়া

পরদিন সকালে উঠবে ৫ টা থেকে ৬ টার মধ্যে কারন কংলাক পাহাড় দেখতে যেতে হবে। এটা মিস মানে অনেক বড় কিছুই মিস তাই একটু কষ্ট করে ঘুম বিসর্জন দিয়েই উঠু পরুন। ৩০-৪০ মিনিট ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে চলে যান রাস্তা একটাই তাই খুব সহজে যেতে পারবেন। কংলাক এর মাথায় সুন্দর বসার জায়গা আছে এবং সকালে এখানে পুরোটা মেঘে ঢাকা থাকে। ৯ টার মধ্যে কংলাক পাড়া ঘুরে কটেজে চলে আসুন। ১০ টার মধ্যে ব্যাগ ঘুছিয়ে নাস্তা করে ১০ টা ৩০ মিনিটে চান্দের গাড়িতে করে আর্মির এসকর্ট সাথে খাগড়াছড়ির পথে রওনা দিন।

খাগড়াছড়ি ঝুলন্ত ব্রীজে আমরা

খাগড়াছড়ি পৌছে লাঞ্চ করে রেস্ট নিয়ে ৩ টার মধ্যে রওনা দিন। চান্দের গাড়ি করে ঝুলন্ত ব্রীজ, রিসাং ঝর্ণা, সবশেষে আলুটিলা গুহা দেখে সন্ধ্যার পর চলে আসেন ডিনার করতে। ডিনার করেই বাস কাউন্টারে চলে যান কারন ৯ টায় লাস্ট ট্রিপ।

কিভাবে যাবেন? 

যেকোন বড় বাস স্ট্যান্ড যেমনঃ ফকিরাপুল, ধানমন্ডি ৩২ নং, সায়দাবাদ থেকে যেতে পারবেন। বাস ভাড়া নন এসি ৫২০ টাকা। চান্দের গাড়ি খাগড়াছড়ি থেকে যাবে রাতে থাকবে এবং পরদিন খাগড়াছড়ি এনে দিবে খরচ ৭১০০ টাকা এবং ড্রাইভারদের ২ জনের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে অথবা, অতিরিক্ত ১০০০ টাকা। আর যদি খাগড়াছড়ি এসে আরো বাকি তিনটা স্পট ঝুলন্ত ব্রীজ, রিসাং ঝর্না, আলুটিলা গুহা দেখতে যান অতিরিক্ত আরো ২০০০ টাকা দিতে হবে।

চান্দের গাড়ির ড্রাইভার আলী ভাইয়ের নাম্বার 01825372762

কোথায় থাকবেন? 

আর্মির বিল্ডিং গুলোতে থাকতে অনেক খরচ যেমনঃ ৪০০০-৮০০০ টাকা। যারা এগুলাতে থাকতে চান 01882009500 যোগাযোগ করতে পারেন। থাকার জন্য এখন অনেক ক্লাসি কটেজ আছে। যেমনঃ মেঘপুঞ্জি ফোন নং 01911-722007, জুমঘর 01884-208060, মেঘমাচাং 01822-168877। এই তিনটা আমার প্রথম পছন্দ, এগুলার ভাড়া ২৫০০-৩০০০ টাকা প্রতিরাত। এগুলাতে রুম না পেলে এর পর আসে সাজেক লুসাই কটেজ, আলো রিসোর্ট, রক প্যারাডাইস ইত্যাদি অনেক কটেজ। ব্যাচেলর’রা কম খরচে থাকতে চাইলে রুইলুই পাড়া ক্লাব হাউজে থাকতে পারেন, সামনে ফাকা স্পেস ও আছে। প্রতি রাত ১৫০ টাকা ভাড়া নিবে জন প্রতি। ক্লাব হাউজের লক্ষন মামার 01860 103402 নাম্বার এটা।

কোথায় খাবেন? 

এই পার্টটা টা আমার সবচেয়ে পছন্দের পার্ট। হাহা। সাজেকে খাবার সংকট আছে তাই আগে থেকেই মানে যাওয়ার আগেরদিন ই যেখানে থাকবেন তাদের খাবার অর্ডার করে রাখবেন। দুপুরে যা খেতে পারেনঃ জুমের ভাত, পাহাড়ি মুরগীর মাংস, ভর্তা ২-৪ রকমের, পাহাড়ি বিভিন্ন শাক সব্জী, ডাল ইত্যাদি। খাবারের দাম ওখানে বেশি পার প্লেট ১৮০-২৫০ পর্যন্ত হতে পারে। দামদর করে নিবেন।

রাতের খাবার অবশ্যই পরোটা, বার বি কিউ এবং সব্জি বেস্ট ম্যানু আমার কাছে। পরদিন খাগড়াছড়ি ফিরে খাং মং অথবা, সিস্টেম রেস্টুরেন্ট ডিনার করতে পারেন, তবে সিস্টেম আর খাং মং একই খাবার কিন্তু সিস্টেমে দাম ডাবল প্রায় তাই খাং মং এ খেতে পারেন। বেশি লোক হলে আগেই খাবার অর্ডার করে রাখবেন। ফোন নং 01866 933404

খাং ময়ে খেতে পারেন বাশ কুড়ুল সব্জি, ব্যাম্বো চিকেন (বাশের মধ্যে রান্না করা মুরগি), লইট্টা ফ্রাই, হাসের মাংস, ৪-৫ রকমের সব্জি, লাউ চিংড়ি, ভর্তা ভাজি ইত্যাদি নানা আইটেম। আমরা প্রতিবার ই গ্রান্ড ডিনার করার চেষ্টা করি এখানে।

খরচাপাতিঃ 

সাজেক ১/২ জন গেলে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তাই গ্রুপে বা, ৮-১০ জনের দল নিয়ে সব রিজার্ভ করে যাওয়া ভালো। আমি এখানে ১০জনের দল গেলে যেমন খরচ হবে লিখে দিচ্ছি। জন প্রতি ঢাকা থেকে বাস ভাড়া ৫২০ টাকা করে ১০৪০ টাকা। চান্দের গাড়ি জনপ্রতি ১০০০ টাকা খাগড়াছড়ি সহ। চার বেলা খাবার এবং নাস্তার জন্য ১০০০ টাকা। আর কটেজ ভাড়া জনপ্রতি ধরলাম ৫০০-১০০০ টাকা। সবমিলিয়ে ৪০০০-৪৫০০ এর মধ্যে খুবই ভালো মানের ট্যুর দিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু গ্রুপ না এই খরচে হবে না, খরচ আরো অনেক বাড়তে পারে।

সাজেক ট্যুরের বিশেষ নির্দেশনাঃ 

১/ রিসাং ঝর্ণায় যারা গোসল করবেন অবশ্যই ২-৩ টা এক্সট্রা হাফ প্যান্ট নিবেন।
২/ মশার জন্য ওডোমস ক্রিম নিয়ে যাবেন। ৫০ টাকার মতো দাম, ফার্মেসিতে পাবেন।
৩/ পাহাড়ি কলা, আনারস এইসব সামনে পেলে অবশ্যই খাবেন। অমৃত একদম।
৪/ অবশ্যই সবকিছু ঢাকা থেকে বুকিং করে যাবেন। নয়তো সময় নষ্ট হবে অনেক।

গ্রুপ ট্যুরে সাজেক যেতে চাইলে? 

ছুটি ট্রাভেল’স সময় এবং সিজন অনুযায়ী গ্রুপ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে।
গ্রুপে জয়েন করতে ক্লিক করুন এখানে

পরবর্তী সাজেক ট্যুরঃ ২৪-২৬ শে অগাস্ট।
ইভেন্ট লিঙ্কঃ এখানে ক্লিক করুন। অথবা, এখানে যান https://fb.com/events/1971683759783533

মন্তব্য করতে ভুলবেন না
TAGS
মেহেদী হাসান
ঢাকা, বাংলাদেশ

হ্যা, এটাই আমি মেহেদী! এতক্ষণে বুঝে যাওয়ার কথা আমি একজন শখের ট্রাভেলার। পেশায় সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার। আমার জীবনের ষোল আনাই শখ। যেমন, সব ধরনের শখের মতো এই ব্লগটিও শখের। এটি আমার যাযাবর জীবনের ডায়েরী!