নিঝুম দ্বীপ, কিভাবে যাবেন, ঘুরবেন, কোথায় থাকবেন

21 Dec

নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের আদর্শ সময় শীতকাল। মূলত শীত ক্যাম্পিং এর জন্য আদর্শ সময় আর নিঝুম দ্বীপ অধিকাংশ ট্রাভেলার ই যান ক্যাম্প করার জন্য। তবে যারা প্রথমবার ক্যাম্পিং করছেন অবশ্যই নিজেরা না করে কোন গ্রুপের সাথে যান (অনিজ্ঞতার কারনে বিপদে পরতে পারেন)। আর যারা আগে করেছেন তারা নির্ধিদায় চলে যান। চাইলে ক্যাম্পিং ছাড়াও নিঝুম দ্বীপ ঘুরতে যেতে পারেন।

বন্দরটিলা বাজারে যেতে পথে গ্রামের রাস্তা, গ্রাম

ট্যুর প্ল্যানঃ

অবশ্যই ২ রাত থাকার প্ল্যান করুন। কারন প্রথমদিন যেতে যেতে দুপুরের খাবার সময় হয়ে যাবে। বিকেলে ঘুরে রাতে থেকে পরদিন সকালে রওনা দিতে নিশ্চয় ভালো লাগবে না, আর কিছুই দেখা হবে না। ২ রাত বা, ৩ রাত প্ল্যান করলে আরামে ঘুরে দেখতে পারবেন।

রওনার দিনঃ লঞ্চে করে সদরঘাট ফারহান ৩,৪ লঞ্চ এবং তাসরিফ ১,২ লঞ্চ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ছেড়ে যায় হাতিয়ার উদ্দেশ্যে। ফারহান ৫টা ৩০ মিনিটে ছাড়ে আর তাসরিফ ৬ টায়। অনিবার্য কারন ছাড়া কোনটাই ১ মিনিট ও দেরি না। আর বৃহস্পতিবার হলে অবশ্যই দুপুরে রওনা দিয়ে ঘাটে যেয়ে বসে থাকুক কারন প্রচন্ড জ্যাম হয়। ডেকে ভাড়া ১৫০ টাকা। কেবিন ভাড়া সিঙ্গেল ৭০০ টাকা আর ডাবল কেবিন ১৫০০ টাকা। ভাড়া সব সময় চেঞ্জ হয় তাই যাওয়ার আগে ফোন দিয়ে তখনকার ভাড়া জেনে নিবেন।

২ মাস আগেও ভাড়া ডাবল ছিলো তাসরিফ আসার পর ভাড়া কমিয়েছে। তাই ভাড়া নিশ্চিত হয়ে নিবেন আগে। কেবিন নিতে চাইলে ১০ দিন আগে বুক করুন কমপক্ষে। লঞ্চের ফোন নাম্বারঃ এম.ভি. ফারহান-৩ – ১৭৮৫৬৩০৩৬৫, এম. ভি. ফারহান-৪ – ১৭৮৫৬৩০৩৭০ এম.ভি. তাসরিফ ১ – ১৭৩০৪৭৬৮২২, এম.ভি. তাসরিফ-২ – ০১৭৩০৪৭৬৮২৪। রাতের লঞ্চের ক্যান্টিনে খেয়ে নিন পার হেড ১৫০ টাকায় হয়ে যাবে।

লঞ্চে মনপুরা অতিক্রম করে হাতিয়া যাওয়া পথে সুর্যোদয়

১ম দিনঃ সকাল ৮ টায় লঞ্চ হাতিয়া পৌছে যাবে। লঞ্চের টাইম টেবিলের সাথে হিসেব করেই ট্রলার আসে ঘাটে তাই দুঃচিন্তার কিছু নেই। গরম গরম সিঙ্গারা নিয়ে আসে বাচ্চার খেতে পারেন দারুন স্বাদ। আর, ভুলেও বাই রোড না গিয়ে ট্রলারে উঠে পরুন। আড়াই ঘন্টায় আরামেই পৌছে যাবে নিঝুম দ্বীপ নামারবাজার ঘাটে। বাই রোড গেলে হোন্ডায় ব্যাগ, তাবু এসব নেয়া খুবই ঝামেলা আর রাস্তা ও ভাঙ্গা। এছাড়া মোক্তারিয়া যেয়ে আবার নৌকা দিয়ে পার হয়ে আবার হোণ্ডা নেয়া লাগে। কি দরকার এতো ভেজালের।

চৌধুরি খাল থেকে বনের ভিতরে যাওয়ার সময়

দুপুরে নেমে হোটেল বুক করা থাকলে হোটেলে চলে যান। সব হোটেল ৫-১০ মিনিটের রাস্তা। বুক করা না থাকলে খোজাখুজি করে উঠে যান একটায়। দরদাম করবেন অবশ্যই। আমরা ছিলাম নিঝুম রিসোর্টে (ডাক বাংলো নামে চিনে সবাই, নিঝুম রিসোর্ট বললে চিনবে না)। এখানেও থাকতে পারেন একমাত্র এটার সামনেই সুন্দর বসার জায়গা আছে। বুকিং দিতে সবুজ ভাই ০১৭৩৮২৩০৬৫৫ এছাড়া আরো হোটেল আছে যেমনঃ হোটেল শাহিন ০১৮৬৩১৫০৮৮১, হোটেল সোহেল ০১৮৬৮৬১২১৩৫, হোটেল দ্বীপ সম্পদ ০১৭২০ ৬০১ ০২৬ এগুলো ছাড়া আরো ৫-৬ টি হোটেল আছে। দুপুরে অবশ্যই খাবেন আলতাফ চাচার আশিক হোটেলে। ভুলেও অন্যকোন হোটেলে খেয়ে পস্তাবেন না।

ভার্জিন আইল্যান্ড দমার চর যাওয়ার পথে

বিকেলে কবিরাজের চর আর চৌধুরি খাল ঘুরে আসুন। হোটেল থেকে মাঝি না নিয়ে নৌকা আছে এমন মাঝি নেন অবশ্যই ৫০০-১০০০ টাকা বাচবে + পরদিনও তাকে নিয়ে ঘুরে আসতে পারবেন। চৌধুরি খাল আর কবিরাজের চর ঘুরতে ১০ জনের একটা দলের জন্য খরচ লাগবে ১৮০০-২০০০ টাকা। আমাদের মাঝি নুরু ভাই এর নাম্বার ০১৭৪৭ ৬২০৯৪৩ ওনাকে কল দিলে ২ দিন উনি আপনাদের সাথে সাথেই থাকবে সব ধরনের হেল্প করবে।  আমরা ওনার বাসায় ঝোলা গুড়, নারকেল, নিঝুম দ্বীপের পিঠা খেয়েছিলাম সবাই। ওনাকে কিছু টাকা দিলে উনি ই বাজার করে ওনার বউকে দিয়ে সব করিয়ে রাখবে (টিপস দিতে ভুলবেন না)।

২য় দিনঃ ২য় দিন আমরা ঘুরেছিলাম দমার চর, ভার্জিন আইল্যান্ড, বন্দরটিলা সহ পুরো নিঝুম দ্বীপের চারিদিকে চক্কর দিছিলাম। চাইলে আপনারাও করতে পারেন অথবা বন্দরটিল ঘুরে নামারবাজার ব্যাক করতে পারেন খরচ একই হবে ৩০০০ টাকার মতো। দুপুরে ফিরে আলতাফ চাচার হোটেলেই খাওয়া দাওয়া করুন। বিকেলে সবুজ ভাইকে সকালে বলে রাখবেন  বার বি কিউ করতে চাইলে। উনার মুরগী বা, কোরালের বার বি কিউ নিঝুম দ্বীপের সেরা বার বি কিউ এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। অন্য হোটেলে উঠলেও ভাই এর সাথে যোগাযোগ করে খেতে পারেন ভাই খুবই ভালো মানুষ।

কবিরাজের চর, নিঝুপ দ্বীপ

৩য় দিনঃ সকালে উঠেই নাস্তা করে ট্রলার ঘাট ৭টা সাড়ে ৭ টার মধ্যে চলে তারপর ট্রলারের ভালো একটা জায়গা দখল করে ১ ঘন্টা বসে থাকেন। ট্রলার ১০ টায় ছাড়বে ১২ টায় ফারহান লঞ্চে / তাসরিফে তুলে দিবে আপনাদের। তারপর আবার ১৫-১৬ ঘন্টার বিশাল জার্নি করে ভোরের আগেই সদরঘাট চলে আসবেন।

ক্যাম্পিং এর জন্য নির্দেশনাঃ

১/ চৌধুরি খাল সেফ প্লেস তবে ২০-৩০ জন হলে আরামেই ক্যাম্প করতে পারবেন। ৫-১০ জন নিয়ে ওখানে ক্যাম্প করতে পারবে না কারন বিরাট বন আর শিয়ালের উৎপাত। লোকাল কেউ চৌধুরি খালে ক্যাম্পিং করতে বলবে না সবাই ভয় দেখাবে। তাই নিজ দায়িত্বে সব করবেন।

২/  নামারবাজার বিচ সবচেয়ে সেফ প্লেস ক্যাম্পিং এর জন্য। বাজার থেকে ১০ মিনিটের রাস্তা এই বিচ। এখানে করলে খাওয়া দাওয়ার জন্য বাজারে আসতে পারবেন + যেকোন দরকারে লোকজন পাবেন বাজারে। বাজার সারারাত কম বেশি চালু থাকে (টুরিস্ট বেশি থাকলে)।

৩/ শীতে গেলে অবশ্যই তাবুর সাথে চাঁদর, স্লিপিং ব্যাগ ম্যাট সহ নিয়ে যান। নয়তো ঘুম হারাম হয়ে যাবে।

৪/ লাকরি লাগলে নুরু ভাইকে বললেই হবে মোটামুটি ১০০০ টাকা দিলে ২০কেজি লাকরি + কেরোসিন এনে দিবে উনি। লাকরির দাম অনেক সব জায়গাতেই তাই ফ্রি আশা করবেন না।

খরচাপাতিঃ 

যদি ডেকে যান আসা যাওয়া = ৩০০ টাকা।
প্রতিবেলা খাবার = ২০০*৬ = ১২০০ টাকা।
যাওয়ার রাতে লঞ্চে খাওয়া = ১৫০ টাকা।
হোটেল খরচ ২০০০*২=৪০০০ টাকা (৪জন শেয়ারে) জনপ্রতি = ১০০০ টাকা
ট্রলার ভাড়া যাওয়া – আসা = ৪০০ টাকা।
তাবু ভাড়া = ২০০-৪০০ টাকা (যদি ১ রাত ক্যাম্প করেন)
লাকড়ি, নাস্তা, পিঠা, এটা সেটা সহ পার হেড আরো = ৫০০ টাকা।
কবিরাজের চর, চৌধুরি খাল পার হেড ৮জনের দল হলে = ২৫০ টাকা।
দমার চর, ভার্জিন আইল্যান্ড, বন্দরটিলা ৮জনের দল হলে = ৪০০ টাকা।
মোটামুটি জনপ্রতি ৪০০০ টাকা করে খরচ হবে।


ভ্রমন সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্ন / ইনফরমেশন লাগলে আমাকে ফেসবুকে নক করতে পারেন। অথবা, আমার ফেসবুক ট্রাভেল গ্রুপ “ছুটি ট্রাভেল গ্রুপ” এ পোস্ট করলে আমাদের সহযোগিতা পাবে।