নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ
Guideline

বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি ও নাফাখুম ভ্রমণ গাইডলাইন

on
February 10, 2018

কথায় আছে “থানছি যে দেখে নাই সে বাংলাদেশ দেখে নাই”। তাই ছুটির এডভেঞ্চার প্রিয় ১৫জন ট্রাভেলার নিয়ে ঘুরে আসলাম বাংলার ভূস্বর্গ বান্দরবান, থানচি, তিন্দু, রাজাপাথর, রেমাক্রি ও নাফাখুম। নাফাখুম মূলত বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলায় অবস্থিত। প্রায় ৩০ ফুট জলপ্রপাতটি রেমাক্রি হয়ে সাঙ্গু নদীতে মিলেছে যেখানে মিলনস্থলে প্রাকৃতিক ভাবেই কয়েকধাপ সিঁড়ির মত করে হেলে দুলে নৃত্যের ছন্দে সাঙ্গু তে মিশে গেছে। আর এই নৃত্যের দলে এখানে সৃষ্টি হয়েছে আরেকটি ফলস যার নাম রেমাক্রি খুম। খুবই দৃষ্টিনন্দন দুটি ফলস দেখাই একমাত্র উদ্দেশ্যে হলেও বান্দরবান থেকে থানচি তারপর নৌকায় করে তিন্দু, রেমাক্রি যাওয়া সেখান থেকে ২ ঘন্টা ট্রেকিং করে নাফাখুম যাওয়ার পথ যেনো স্বর্গের থেকে সুন্দর, তার থেকেও মনোরম।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

বান্দরবান নেমে সকালেই যাই চিম্বুক

রেমাক্রি, নাফাখুম ঘুরে আসা খুব কঠিন কিছু না তবে দরকার নিজের প্রতি বিশ্বাস আর মনোবল। অনেকেই বলেন আগে ২/১ টা ঝর্ণা ঘুরার অভিজ্ঞতা থাকা দরকার আমিও সেই কথাই বলবো। আসলে ঝর্ণা মানেই ট্রেকিং সেটা পাহাড়ের উচু নিচু বাক, কঠিন পথ পেরিয়েই যেতে হয়। যদি ছোট ২/১ টা ঝর্ণায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকে তাহলে খুবই ভালো তা না হলেও কোন সমস্যা নেই যদি একটু সাহস থাকে।

ট্যুর প্ল্যানঃ

ট্যুর প্ল্যান আসলে নিজেদের সময় ও সুবিধে মতো সাজিয়ে নিতে হয়। যেভাবে সময় বাচবে এবং অর্থ সাশ্রয় হবে আমি সেভাবে প্ল্যান করে দিচ্ছি। যদি আপনাদের বান্দরবান ঘুরার উদ্দেশ্যে থাকে তাহলে প্ল্যান একরকম হবে আর যদি বান্দরবান বাদ দিয়ে সরাসরি নাফাখুমের পথ ধরতে চান তাহলে প্ল্যান আরেক রকম হবে।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

থানচি থেকে নৌকায় রেমাক্রি যেতে পথে

অবশ্যই রাত ১০টার বাসে রওনা দিন তাহলে জ্যাম না থাকলে সকাল ৬ টায় পৌছে যাবেন বান্দরবান শহরে।বান্দরবান শহরে ঘুরার মতো নীলাচল, মেঘলা, শৈলপ্রপাত যা ১২টার মধ্যে ঘুরা শেষ হয়ে যাবে। তারপর শহরে ব্যাক করে লাঞ্চ করে থানচির পথে রওনা হবেন। থানচি পৌছতে সন্ধ্যা হবে তাই এখানে থানচি কুটির / বিজিবি কটেজ এ রাত কাটিয়ে দিন। পরদিন সকালে থানচি ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে রওনা দিন রেমাক্রির পথে।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

রাজাপাথর এলাকায় রেস্ট নেয়ার সময় ছবিটি তোলা

রেমাক্রি পৌছাতে কমপক্ষে ৩ঘন্টা। আর যদি তিন্দু এবং রাজাপাথর সময় ব্যয় করে তাহলে ৪ঘন্টার মতো। সকাল ৬টায় রওনা দিলে ১০টার মধ্যে রেমাক্রি। এবার চাইলে এখনি ট্রেকিং করে নাফাখুম যেতে পারেন এবং সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে আসবেন। অথবা, রাত রেমাক্রি থেকে পরদিন সকালে নাফাখুম ঘুরে আসলেন। রেমাক্রি থেকে নাফাখুম ঘুরে আসতে আসা যাওয়া দুই ঘন্টা করে চার ঘন্টা আর, যতক্ষন থাকবেন ততক্ষন সময়। মোট ৬ ঘন্টা ধরলেই হবে। নিজেদের মতো সাজিয়ে নিন সময়। তবে এই প্ল্যানটা খুব একটা ভালো প্ল্যান নয়।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

সাঙ্গু শুকিয়ে যাওয়ায় কিছু জায়গা হেটে পার হই

বেস্ট প্ল্যান হবে যদি শহরে না ঘুরে ১ম দিন বান্দরবান পৌছে সকালেই চান্দের গাড়ি করে থানচির পথে রওনা দিয়ে দেন। যাওয়ার পথে চিম্বুক আর নীলগিরি আধা ঘন্টা করে দেখে যেতে পারেন। পৌছাতে দুপুর ১২টা বাজবে। থানচি পৌছে কোন একটা হোটেলে খেয়ে নৌকায় উঠে পরুন। নৌকা তিন্দু, রাজাপাথর হয়ে সন্ধ্যার মধ্যে রেমাক্রি চলে যাবে। রেমাক্রি রাত কাটিয়ে সকালে ৬ টার মধ্যে নাফাখুমের পথে ট্রেকিং শুরু করবেন।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

থানচি থেকে রেমাক্রি যেতে নৌকায় অসাধারন দৃশ্য

দুপুর ১২/১ টার মধ্যে রেমাক্রি ফেরত এসে নৌকায় করে বিকেল ৩-৪টার মধ্যে থানচি ব্যাক করে পূর্বে ঠিক করে রাখা চান্দের গাড়ি করে ৭-৮ টার মধ্যে বান্দরবান শহরে ফেরত এসে ডিনার করে রাত ১০টার গাড়িতে ঢাকা ব্যাক করার গাড়ি ধরলেন। এতে সময় বাচবে এবং দ্রুত সব কভার করতে পারবেন।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

বিকেলে রেমাক্রি পৌছেই আগে গোসল সেরে নেই ফলসে

কিভাবে যাবেন? 

আগেই বলেছি অবশ্যই রাতের ৯-১০টার গাড়িতে (কলাবাগান, গাবতলি, ফকিরাপুল থেকে শ্যামলি, ইউনিক, হানিফ সহ অনেক বাস ছেড়ে যায় প্রতিদিন।) রওনা দিন যাতে জ্যামে পরলেও সকালে ৬-৭টার মধ্যে বান্দরবান পৌছে যান। সেখান থেকে থানচি বাস স্ট্যান্ড যেতে পারেন ১০-১৫টাকা সিএনজি ভাড়া। তবে ১০জন হলে চান্দের গাড়ি নিয়ে যাওয়া বেস্ট হবে। কারন, থানচির বাস গুলো স্লো এবং অনেক সময় লাগায় পৌছাতে। চান্দের গাড়িতে ১০জন আরামে বসা যায়। একটু কষ্ট হলেও সর্বোচ্চ ১২জন আর সামনে ১জন সহ ১৩ জন যেতে পারবেন। ঢাকা থেকেই থানচি গাইড ঠিক করে যাবেন তাহলে ঝামেলা কমবে।

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

খুব ভোরে পাহাড়ি এই স্বর্গের রাস্তা ধরেই নাফাখুম ট্রেকিং শুরু করি

কোথায় থাকবেন?

থানচি থাকতে চাইলে – থানচি কুটির / বিজিব কটেজ।
রেমাক্রিতে – নাফাখুম গেস্ট হাউজ।

কোথায় খাবেন?

১মদিন নাস্তা – কলাপাতা রেস্টুরেন্ট (বাসস্ট্যান্ডে)
১ম দিন লাঞ্চ – থানচিতে যেকোন হোটেলে।
১ম দিন ডিনার – রেমাক্রিতে (গাইড নিয়ে যাবে)

২য়দিন নাস্তা – রেমাক্রিতে (গাইড নিয়ে যাবে)
২য় দিন লাঞ্চ – থানচি ফিরে থানচিতে।
২য়দিন ডিনার – কলাপাতা রেস্টুরেন্ট (বাসস্ট্যান্ডে)

নাফাখুম, বান্দরবান, থানচি, রেমাক্রি, ট্যুর, ভ্রমণ

অবশেষে ক্লান্তিকর ট্রেকিং শেষে দেখা পাই নাফাখুম ঝর্ণার

খরচাপাতিঃ

১০জনের একটা দলের জন্য ১রাত – ২দিনের ট্যুরের পুরো খরচ তুলে ধরছি।
বাস ভাড়া ৬২০*২ = ১২৪০ আপডাউন।
চান্দের গাড়ি ৬০০০ * ২ = ১২,০০০ (জনপ্রতি ১২০০ টাকা)
থানচি গাইড খরচ ৮০০ টাকা ১ম দিন, ৭০০ টাকা ২য় দিন = ১৫০০ টাকা (জনপ্রতি ১৫০টাকা)
রেমাক্রি গাইড খরচ ৫০০ টাকা (জনপ্রতি ৫০ টাকা)
রেমাক্রি থাকার খরচ জনপ্রতি ২০০ টাকা।
১ম দিনের খাবার খরচ ৮০+১৫০+১৫০ = ৩৮০ টাকা জনপ্রতি।
২য় দিনের খাবার খরচ ৮০+১৫০+২০০=৪৩০ টাকা জনপ্রতি।
থানচি – রেমাক্রি – থানচি নৌকার খরচ ৩টা = ১২,০০০ টাকা (জনপ্রতি ১২০০ টাকা)
সর্বমোট খরচ = ৪৮৫০ টাকা জনপ্রতি ( ~৫০০০ টাকা)

প্রয়োজনীয় তথ্যাবলীঃ 

থানচি গাইড – 01849556340 (হারুন ভাই), 01833846234 (হাসান), 01885088796 (নথি ক্রিপুরা)।
থানচি বাস বান্দরবান থেকে ছাড়ে – সকাল ৮ টায়, ৯ টা ৩০, ১০ টা ৪৫, ১২ টা, ১ টা ৩০, ৩ টা।
থানচি থেকে বান্দরবান ছাড়ে – সকাল ৭টায়, ৮টা ৩০, ১০ টা, ১১ টা ৩০, ১টা, ৩টা।
চান্দের গাড়ি – বান্দরবান পৌছে জীপ সমিতি থেকে নিবেন।
বাসের ফিরতি টিকেট – ১ম দিন পৌছে নাস্তা করেই টিকেট কেটে নিবেন।
রেমাক্রি থাকা – থানচি গাইড ঠিক করে দিবে।
রেমাক্রি গাইড – থানচি গাইড ঠিক করে দিবে।
নৌকা ভাড়া – থানচি গাইড ঠিক করে দিবে।

বিশেষ নির্দেশনাঃ 

১/ জাতীয় পরিপত্রের বা, পাসপোর্টের ১টা ফটোকপি নিবেন।

২/ Cap Doxycycline 100 mg এই ওষুধটি ৩০টা (৩পাতার মতো) কিনে নিবেন ট্যুরের ৪-৫দিন আগেই। এটি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ করে এবং যেকোন ফার্মেসীতে পাবেন। ট্যুরে যাওয়ার ২ দিন আগে থেকে রাতের খাবার খাওয়ার পর প্রতিরাতে একটি করে খাওয়া শুরু করবেন এবং ট্যুরের দিনগুলোতেও রাতের খাবার খেয়ে প্রতিদিন একটি ক্যাপসুল খাবেন এবং ট্যুর থেকে ফিরে আসার টানা ২৮ দিন পর্যন্ত প্রতি রাতে খাবার খাওয়ার পর একটি করে ঔষধ খাবেন। ওডোমস, মোজা, গ্লোভস, গামছা, শীতের কাপড়, হাফপ্যান্ট।

৩/ কেউ যদি সাতার না জানেন তাহলে লাইফ জ্যাকেট নিতে পারেন। তবে লাইফ জ্যাকেট ম্যান্ডাটরি নয় কারন শীতে সাঙ্গু শান্ত থাকে। তবে কারো নিজের এক্সট্রা সিকিউরিটি লাগলে অবশ্যই নিবেন। শীত ছাড়া গেলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট লাগবে। থানচিতে ৫০ টাকা দৈনিক ভাড়া পাওয়া যায়।

৪/ অবশ্যই পাওয়ার ব্যাংক নিতে হবে কারন ইলেকট্রিসিটি তেমন পাবেন না এবং সাথে ওয়াটারপ্রুফ ব্যাগ নিতে হবে মোবাইল / ইলেকট্রনিক্স জিনিস সুরক্ষার জন্য। অন্যের ভরসায় থাকবেন না।


ভ্রমন সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্ন / তথ্য / ট্যুর প্ল্যানের জন্য আমাদের ফেসবুক গ্রুপ ছুটি ট্রাভেল গ্রুপে জয়েন করতে পারেন। 

TAGS

LEAVE A COMMENT