ভাটির দেশের পথে প্রান্তরে, মোহনগঞ্জ ভ্রমণ (পর্ব-০১)

13 Dec

হাওর শব্দটা মনে আসলেই কেমন যেনো ঠান্ডা ঠান্ডা একটা শিরশিরে অনুভূত হয় শরীরে মধ্যে আর চোখের সামনে ভেসে উঠে বিস্তর জনশূন্য প্রান্তর যেখানে শুধু পানি আর পানি। ডানে, বায়ে, উপরে নিচে সব দিকেই। এতো বার হাওরে গেলেও আমি কিন্তু বেশি দিন হয় নাই প্রথম হাওরে গেছি। সিলেটি লোকজনের সাথে থেকে থেকে কয়দিন পর পর হাওর বাওরের গল্প শুনতে শুনতে কান ঝালা পালা হয়ে গেছিলো। গেলো বছর ২০১৭’তেই প্রথম বার আমার হাওর যাত্রা আর সেবার বিরাট আগাম বন্যা হাওরে।

বাসের টিকেট কেটে নির্দিষ্ট দিনে আমরা দুজন রওনা দিলাম। সারারাত বাসে তো আর ঘুম আসতেছেনা হাওরের শুরু কেমনে সেইটা দেখার আশায়। প্রথমবার যেবার কক্সবাজার গেলাম সমুদ্র দেখতে তখনও সেম ফিলিংস ই হয়েছিলো আমার। শুনতে খুবই হাস্যকর লাগতেছে কিন্তু আমার কিছুই করার নাই। সমুদ্র শুরু হলো কিভাবে সেটা দেখার আর জানার ইচ্ছা ছিলো খুবই তীব্র। ব্যাপারটা অনেক এমনই হাওরের ক্ষেত্রেই। শুনেছি মাইলের পর মাইল হাওর, এইমাথা অই মাথা পানি আর পানি। এমন জিনিসের শুরুটা না দেখলে হয় বলেন?

এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বাস প্রায় সুনামগঞ্জের কাছে সেই সাথে মোষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে আকাশ কালো করে। কিছুক্ষন পরই দেখতে পেলাম দেখার হাওর। দেখার মতোই একটি হাওর। আমারও ইচ্ছে পূরণ হলো দেখার হাওর দেখে। সুনামগঞ্জ নেমে সিএনজি নিয়ে তাহিরপুর, তারপর বাইক, নৌকা, ভ্যান, ট্রাক যেখানে যা পাই তা নিয়েই জামালগঞ্জ, পাথারিয়া, মুরাদপুর, বাংলা বাজার, ডিঙ্গাপোতার নানা জায়গায় ঘুরলাম। সেই গল্প আর এবার হবে না। প্রথমবার হাওর ঘুরে এসে আবারো ২ বার গেলাম হাওরে একই বছরে। হাওরের প্রেমে পরে গেছি যে!

দ্বিতীয় বার যখন হাওরে গেলাম (সুনামগঞ্জ – তাহিরপুর – টাংগুয়ার রুটে)

এই গেলো ১ম আর ২য় বার হাওর যাত্রা। এসব গল্প পরে আরেকদিন করবো ইনশাল্লাহ। এ বছর (২০১৮) হাওরে গেলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন রুটে। একাই যাবো মনস্থির করে বের হয়েও শেষ মুহুর্তে রাফি এড হয়ে গেলো। টিকেট ছিলো ১টা মাত্র পরে স্টেশনে গিয়ে আরেকটা টিকেট কাটলাম ওর জন্য। কমলাপুর থেকে মোহনগঞ্জের ট্রেন হাওর এক্সপ্রেস ছাড়লো রাত ১১ টার দিকে। ভোরের আগে আগে ময়মনসিংহ, গৌরিপুর জংশন হয়ে মোহনগঞ্জ স্টেশনে পৌছলাম সকাল ৮ টায়।

মোহনগঞ্জকে বলা হয় হাওরের রাজধানী বা, ভাটির দেশের রাজধানী। অথচ আমাদের ৯৯ ভাগ টুরিস্ট হাওরে যায় সিলেট হয়ে টাঙ্গুয়ারে। মজার বিষয় সব হাওর থেকে মোটামুটি সব হাওরে ট্রলার দিয়ে যাতায়াত করা যায়। তাই যেখানেই যান না কেনো নিশ্চিন্ত থাকুন পথ হারালেও নৌকা পেলেই আবার গন্তব্যে ফিরতে পারবেন।

অন্যসব ট্যুরে আমার বিরাট প্ল্যানিং থাকে তবে এই ট্যুরে তেমন কোন প্ল্যানিং করার সুযোগ পাইনি জাস্ট একটা রুট প্ল্যান করেছিলাম। স্টেশন থেকে নেমে কি করবো চিন্তা আসতেই একটা হোটেলে ঢুকে খেতে বসে গেলাম। খাইতে খাইতে মেধাবী চিন্তা ভাবনা করা যায়। চিন্তা ভাবনা করতেও তো ফুয়েল প্রয়োজন নাকি!

সারাদিনের রুট প্ল্যান (মোহনগঞ্জ থেকে বর্ডার হয়ে টেকেরহাট)

নাস্তা সেরে দেখি অনেক লোক বাইকে করে আসছে – যাচ্ছে। ভাবলাম বাইকে করে বুঝি চলাফেরা করে সবাই। দরদাম করে একটা বাইক নিয়ে নিলাম।  আগে যদি জানতামরে বন্ধু পরের সাত সাতটা দিন এই কারনে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকা লাগবে 😛

বাইক চলা শুরু হলো ফাকা রাস্তা ধরে, একদিকে ধানের ক্ষেত, আরেকদিকে হাওরের পানি রাস্তার দুই ধারে গাছপালা আর সতেজ বাতাস। সারারাত ট্রেনে না ঘুমিয়ে একটু খারাপ লাগছিলো তবে বাতাস খেয়ে মুহুর্তেই শরীর চাঙ্গা হয়ে গেলো। যতই ভিতরে যাচ্ছি ততোই অবাক হচ্ছিলাম কারন গ্রামে বাড়ি থাকলেও ছবিতে সারাজীবন যেমন দেখেছি তেমন গ্রাম কখনোই দেখা হয় না। আসলে ভাগ্যে মেলে না।

ধানক্ষেতের পাশে চিকন খাল কচুরিপানায় ভর্তি দূরে পাহাড় আর, টুকরো টুকরো বাড়ি ঘর। রাস্তায় মৃদ্যুমন্দ বাতাস আর অনেকক্ষন পর পর কিছু লোকজনের দেখা পাওয়া যায় এই গ্রামে

দেখুন তো শেষ কবে এমন গ্রাম দেখেছিলেন? যদি দেখে থাকেন তো আপনি ভাগ্যবান। আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি এই কারনে। এমন গ্রামও এখনো আমাদের প্রিয় দেশে আছে।

মন্তব্যসমূহ / আলোচনা