Guideline

ইলিশের শহর চাঁদপুর ভ্রমণ

on
August 29, 2017

২৪ শে অগাস্ট হুট করেই ইভেন্ট ছাড়া ঘুরে আসলাম চাঁদপুর। মূলত উদ্দেশ্য ছিলো একটু ফ্রেশ বাতাস খেয়ে আসা। ১/২ জন করতে করতে দলের সাইজ হলো ৫ জন। নোমান ভাই বসুন্ধরা থেকে আগেই হাজির হয়ে গেলেন সদরঘাট তাকে একটা ডাবল কেবিন নিতে বললাম রফরফ-২ লঞ্চে (রাত ১২টার লঞ্চ)। আমাদের চির লেট কুমার আরাফাত সাহেব বরাবরের মতো লঞ্চ ছাড়া ২ মিনিট আগে বিজয়ীর বেশে লঞ্চে প্রবেশ করলেন।

এভাবেই শুয়ে শুয়ে তাঁরা দেখি আর গান গাই

রাতে না খেয়ে বের হওয়ার কারনে প্রচন্ড ক্ষুদা অনুভব করি তারপর সবাই মিলে চলে যাই লঞ্চের নিচতলায় ইঞ্জিনের পাশের ক্যান্টিনে। কই মাছ, মুরগী ইত্যাদি খাবার অবশিষ্ট আছে। ১৩০ টাকা প্রতি প্লেট হিসাবে মুরগী দিয়ে সবাই খাওয়া সেরে নিলাম।

সকাল বেলা চাঁদপুর ঘাটে নেমে তোলা ছবি

খেতে খেতেই লঞ্চ ছেড়ে দিলো তাই লঞ্চের ঘাট ত্যাগের দৃশ্য আমাদের মিস হলো। ব্যস্ততম সদরঘাট যতই ব্যস্ত আর নোংরা হোক কেমন যেনো জায়গায়টার প্রতি অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করে সবসময় ই। কতো প্রাণের প্রাণকেন্দ্র এই সদরঘাট। ঢেউ কেটে তরতর করে এগিয়ে চললো আমাদের রফরফ-২ লঞ্চ। আমরা “উনো” কার্ডের প্যাকেট নিয়ে চলে গেলাম একদম লঞ্চের ছাদে। যদিও আমার ছাদে উঠতে যার পর নাই কষ্ট হলো।

মোহনায় এসে প্রথম দৃশ্যটি এমনি ছিলো

তীব্র বাতাসে একটু পর কার্ড উরে যায় আর ডাইভ দিয়ে দিয়ে ওগুলারে ধরতে হয়। মনে হচ্ছিলো যেনো সিপ্ল-৩ নং পজিশনে ফিল্ডিং করতেছি। ২-৩ গেম খেলার পর খেলা বন্ধ করে তারা দেখা শুরু করলাম শুয়ে শুয়ে আর সাথে হেরে গলায় গান। নোমান ভাই, ফাহাদ কারো সাথেই আগে কখনো দেখা হয়নি। ফাহাদ ফ্রি হলেও নোমান ভাই একটু আরষ্ট ছিলেন কিছু সময়। তবে, খুব দ্রুতই সেটা কেটে যায়।

একটু পরই শুরু হলো জুম বৃষ্টি

আড্ডা মারতে মারতে কেটে যায় আমাদের পুরোটা সময়। শুধু শুধুই কেবিন বুকিং করেছিলাম আমরা। একবারের জন্যও কেউ কেবিনে ঢুকি নাই। রাত ৩টা ৩০মিনিটে লঞ্চ আমাদের চাঁদপুর ঘাটে নামিয়ে দিলো। কেবিনের জন্য ৮০০টাকা (২জন কাউন্ট করে) বাকি ৩ জনের জন্য ডেকের ভাড়া ১০০ টাকা করে ৩০০ টাকা রাখলো নামার সময়।

ঘাটে নেমেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো, আমরা বরিশাল হোটেলে ডুকে নাস্তা করলাম চা খেলাম ডাবল। তারপর সূর্য উঠার সাথে সাথে চলে গেলাম বড় স্টেশনে মেঘনা-ডাকাতিয়ার মোহনায়। আগের রাতে বৃষ্টি হয়ে কি যে অসাধারনত সুন্দর লাগছিলো জায়গাটা। মোটামুটি সারাটা দিন আমরা এখানেই কাটিয়ে দিয়েছি। মাঝে ওয়ান মিনিটের মিষ্টি আর আইসক্রিম খেয়ে আসি ৭ টার দিকে। দুপুরে স্টেশনের ঘাট থেকে ১কেজি সাইজের ইলিশ কিনে বরিশাল হোটেল থেকে ফ্রাই করে নেই। দুপুরের লাঞ্চটা ইলিশ, ইলিশের ডিম, বেগুন ভাজি, টাকি মাছের ভর্তা দিয়ে ভালোই জমলো।

খাবার পর ঘুরে আসি এক ছোটভাই এবং মুক্তিযোদ্ধা দাদুর বাড়িতে। ৮১ বছর বয়সেও দারুন আড্ডা দিলেন আমাদের সাথে। কে কোথায় থাকি, কি করি সব খোজ নিলেন। দাদুর পরিচয় দেই, নাম জীবন কানাই চক্রবর্তী, গেরিলা টিম কমান্ডার। সেক্টর-৩ এ যুদ্ধ করেছেন চাঁদপুর (সদর),  কুমিল্লা গ্রেটার, নরসিংদী এবং নোয়াখালীর একাংশে। উনি যুদ্ধ করেছেন কিন্তু একাধিক বার অনুরোধের সত্বেও কখনো সার্টিফিকেট নেননি। তার এক কথা, আমি ফ্রিডম ফাইটার সেটা সার্টিফিকেট দিয়ে আমাকে প্রমাণ করতে হবে না।

ফেরার সময় মেঘনা নদী

দাদুর থেকে বিদায় নিয়ে ঘাটে চলে আসি ৫ টার একটু আগে। তারপর, বোগদাদীয়া-৭ লঞ্চে রওনা দেই। এবার ডেকে বসে উনো খেলা শুরু করি, দিনের বেলা নদীর পাশের ঘাটের মানুষের জীবনচিত্র দেখি, মেঘনার কিছু ছবি তুলি, শেষমুহুর্তে ঘন্টা খানেক ঘুমিয়েও নেই আমি। সঠিক সময়েই আমরা পৌছে যাই সদরঘাটে, তখন বাজে প্রায় রাত ৮ টা ৩০।

কিভাবে যাবেন? 

চাঁদপুর ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক ভ্রমণ লঞ্চে এবং সময় ও লাগে কম। সকাল থেকে রাত ১২টা ৩০ পর্যন্ত ঢাকা থেকে চাঁদপুর লঞ্চ ছেড়ে যায়। রফরফ-২, ময়ূর-৭, বোগাদাদিয়া-৭ চাঁদপুরের সবচেয়ে ভালো লঞ্চ। এছাড়াও অনেক লঞ্চ ই সুন্দর এবং কোয়ালিটি মেইনটেইন করে। তাই নিশ্চন্তেই চাঁদপুর লঞ্চে যেতে পারেন। সকালবেলা সদরঘাট থেকে রওনা দিলে ১০-১১ টার মধ্যে চাঁদপুর চলে যেতে পারবেন আবার আমাদের মতো রাত ১২টার লঞ্চে উঠলে সকাল সকাল ই চাঁদপুর ঘুরতে বের হয়ে যেতে পারবেন।

রাতে গেলে সুন্দর ভ্রমন হয় ঠান্ডা বাতাসে শরীর মন চাঙ্গা থাকে, সকালে নামার কারনে সারাদিন ঘুরার অনেক সময় পাওয়া যায়। যদি চরে যেয়ে ঘুরতে চান তাহলে অবশ্যই রাতেই রওনা দিবেন। আমি লঞ্চ চার্ট দিয়ে দিচ্ছি তাতে নিজের মতো করে ডিসিশন নিতে পারবেন।

চেয়ারে যেতে পারেন নিবে ১৫০ টাকা, ডেকে ১০০ টাকা, কেবিন সিঙ্গেল ৬০০ টাকা ডাবল ৮০০ টাকা। এটা আমি বোগাদাদিয়া-৭ এর মূল্য বললাম তবে প্রায় লঞ্চের দাম একই রকম অল্প কিছু কম বেশি হবে আর কি। চাঁদপুরে ৫ টাকায় অটো ভাড়া করে আশেপাশে যেতে পারবেন যেমন ওয়ান মিনিট, বড়স্টেশন, মোহনা, শহরে ভিতরে ইত্যাদি জায়গায়। তবে, ১০ টাকা চাবে দামাদামি করে নিতে পারেন।

কি খাবেন?

হাহা! চাঁদপুর গেলে খাবার একটাই!! পদ্মা মেঘনার অরিজিনাল ইলিশ। বড়স্টেশন যেয়ে দাম দর করে ইলিশ কিনে লঞ্চ ঘাটের কাছে হোটেল গুলোয় চলে আসুন। অবশ্যই মাছ দেখতে দিবেন না। বলবেন মাছ ভেজে দিতে। বড় মাছ দেখলে আর, দামদর না করলে ৫০০টাকা চাবে খাওয়ার শেষে। তাই আগেই সব সেটেল করে নিন। ওয়ান মিনিটের রসগোল্লা আর আইসক্রিম অনেক ভালো। হেভেনের কাটলেটের সুনাম শুনলেও খাবার সৌভাগ্য হয়নি।

খাবার সময় কেউ কারো কথা বলার সময় ছিলো না

কোথায় কোথায় ঘুরবেন? 

চাঁদপুরের ভ্রমনের অর্ধেক মজাই লঞ্চ ভ্রমন। তবে এছাড়াও চাঁদপুরে দেখার মতো দারুন কিছু জায়গা আছে। সবার প্রথমে বড় স্টেশন মোহনা, বড়স্টেশন ইলিশের ঘাট, পুরান বাজারে বড় মসজিদ, মেঘনার বিভিন্ন চর (লজ্ঞীমারার চর, রাজরাজেশ্বর চর ইত্যাদি), পদ্মা, মেঘনা, ডাকাতিয়ার মোহনা ইত্যাদি। শহরের বাইরেও ঘুরার মতো নানা জায়গা রয়েছে।

ইলিশ কিনতে চাইলে?

যদি ইলিশ কিনতে চান তাহলে সর্বনিম্ম ৮-১০ কেজি কিনার প্ল্যান করে যান। ঘাট থেকে মাছ দেখে দামাদামি করে কিনবেন। নরমালি ৭০০-৮০০ গ্রামের ইলিশ ৩০০-৪০০ টাকা ১ কেজির ইলিশ ৮০০-১২০০ টাকা। চাঁদপুরের ইলিশের দাম বেশি, বরিশালের ইলিশ আছে, পদ্মার ইলিশ আছে। দেখে শুনে বুঝে কিনবেন। বাক্সে করে বরফ দিয়ে সুন্দর ভাবে প্যাকেট করে দিবে এক্সট্রা ৩০০ টাকার মতো নিবে। মাছ এই প্যাকেটে ১৫-২০ ঘন্টায় কিছু হবে না। যেহেতু পাইকারি আড়ত ১টা মাছ কিনে কখনোই পোশাতে পারবেন না।

খরচ কেমন?

ডেকে গেলে যাওয়া আসা ২০০ টাকা। দুপুরে খাওয়া ২০০ টাকা, সকালের নাস্তা ৫০ টাকা, সারাদিনে ৫০ টাকার চা, অটো ভাড়া ১০০ টাকা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করলে, নৌকায় উঠলে একেক চরে একেক রকমের দাম নিবে তবে এক-দেড় হাজার থেকে তিন-চার হাজার পর্যন্ত নেয় ছোট থেকে বড় নৌকার সাইজ অনুযায়ি। জনপ্রতি এক-দেড় হাজারে আরামেই ঘুরে আসা যায় একদিন।

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ নোমান ভাই এবং আমি যৌথভাবে।


ভ্রমন সংক্রান্ত যেকোন প্রশ্ন / তথ্য / ট্যুর প্ল্যানের জন্য আমাদের ফেসবুক গ্রুপ ছুটি ট্রাভেল গ্রুপে জয়েন করতে পারেন। 

TAGS

LEAVE A COMMENT