Tag Archives: হুমায়ূন আহমেদ স্যার

যেতে নাহি দিবো হায়, তবু যেতে দিতে হয়

শোনার পর গতকাল থেকেই মনটা খারাপ। কিছুতেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। এই তো সেদিন পড়লাম – অস্ত্রপচার সফল হয়েছে – উনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। ভালো লাগছিলো ভেবে যে এ যাত্রা উনি মনে হয় বেঁচে গেলেন। কিন্তু এসবের মাঝে হঠাৎ করে এভাবে চলে যাওয়া..সত্যিই ভীষণ কষ্ট লাগছে। উনার উপন্যাস পড়ছিলাম – ‘আমরা কেউ বাসায় নেই’। ১০ পর্ব পর্যন্ত পড়েছিলাম। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে লিখেছিলেন বোধহয়। আশা করছিলাম এবার একটু সুস্থ হয়ে আবার লিখবেন..কিন্তু সে তো আর হবে না – দুনিয়ার পাট -ই চুকিয়ে চলে গেলেন। আমার এরকম হয় – যাদের খুব পছন্দ করি – তারা চলে গেলেও বেশ অনেকদিন ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস -ই করতে পারি না! বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা অদ্ভুত অবস্থায় থাকি। তখন ক্ষণে ক্ষণেই সত্যটা মনে হলে বুকটা ব্যথায় টনটন করে ওঠে…লিখতে বসে এই এখন যেমন হচ্ছে!

হুমায়ূন আহমেদ আসলে আমাদের অস্তিত্বের সাথে এমন ভাবে মিশে গেছেন…সেটা অভূতপূর্ব একটা ব্যাপার! উনার সহজ কথা সহজ করে বলবার অসাধারণ একটা ক্ষমতা ছিলো যেটা দিয়ে সবার বুকে অলক্ষ্যে আসন করে নিয়েছেন। উনার বিশেষত্ব হলো – উনার সৃষ্ট চরিত্রগুলো আমাদের গোপন লালিত ফ্যান্টাসিগুলোর কথা বলে। আবার চরিত্রগুলো সহজাত কৌতুকে যেসব কথা বলে – মনে হয় ঐ পরিস্থিতিতে আমরাও ওসব বলতাম। কোনো কোনো কথা পড়ে মনে হয় – এতো আমার নিজের কথা! কীভাবে জানলেন উনি? এই অনন্য গুনের জন্যই তিনি একজন অসামান্য কথা শিল্পী হয়ে উঠেছিলেন। জীবিতকালে অনেকে তথাকথিত বোদ্ধা অবজ্ঞা করতে কসুর করেন নি – কী এমন ছাইপাশ লেখেন! আমার সবসময় তাতে কষ্ট হয়েছে… মুখে অনেক কথাই বলা যায় – সমালোচনাটাও বাঙ্গালীর অতীব প্রিয় বিষয় – কিন্তু কেউ পারলে লিখে দেখাক উনার মত অদ্ভুত যাপিত জীবনের কথকতা!

আজকে আশ্চর্য হয়ে স্মরণ করছি উনার প্রগাঢ় সম্মোহনী শক্তির কথা। কোনোদিন হুমায়ূনের একটা বই হাত গলে গেছে – এটা অসম্ভব ছিলো! আর পাঁচটা বইয়ের মধ্যে শুধু হুমায়ূনের বইটা নিয়েই কাড়াকাড়ি লেগে যেত! কেন? সহজপাঠ্য – সুখপাঠ্য – একবার পড়তে ধরলে আটকে রাখার একটা অসম্ভব ক্ষমতা ছিলো। প্রথম লাইনটা থেকেই অপ্রতিরোধ্য একটা ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করতেন, যেটা যেকোন নতুন লেখকের জন্য অনুকরণযোগ্য! পাঠক জানার জন্য ব্যাকুলতার শীর্ষে পৌঁছে ছটফট করবে…এমন সম্মোহনী তাঁর লেখনী! আফসোস, আমরা আর সেগুলি পাব না! লিখতে লিখতে আবার ভুলে গিয়েছিলাম – হুমায়ূন আর নেই!

হুমায়ূন আহমেদের চলে যাওয়া আমাদের সাহিত্য জগতে একটা অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু কী আর করা? ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি – উনার আত্মা যেন শান্তি পায়। আর ইহজগতে উনার তাবৎ পাগলামি যেন অসংখ্য ভালো কাজের চাপে বিন্দুবৎ হয়ে যাক! আমরা আপনাকে ভীষণ মিস করবো. :(

(সংরক্ষিত লেখা, লেখকঃ উদাসীন)

 
“আমি কখনো অতিরিক্ত কিছুদিন বাঁচার জন্য সিগারেটের আনন্দ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি ভেবে রেখেছিলাম ডাক্তারকে বলব, আমি একজন লেখক। নিকোটিনের বিষে আমার শরীরের প্রতিটি কোষ অভ্যস্ত। তোমরা আমার চিকিৎসা করো, কিন্তু আমি সিগারেট ছাড়ব না।
তাহলে কেন ছাড়লাম?

পুত্র নিনিত হামাগুড়ি থেকে হাঁটা শিখেছে। বিষয়টা পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেনি। দু-এক পা হেঁটেই ধুম করে পড়ে যায়। ব্যথা পেয়ে কাঁদে।

একদিন বসে আছি। টিভিতে খবর দেখছি। হঠাৎ চোখ গেল নিনিতের দিকে। সে হামাগুড়ি পজিশন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। তার ছোট্ট শরীর টলমল করছে। যেকোনো সময় পড়ে যাবে এমন অবস্থা। আমি ডান হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিতেই সে হাঁটা বাদ দিয়ে দৌড়ে হাতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশ্বজয়ের ভঙ্গিতে হাসল। তখনই মনে হলো, এই ছেলেটির সঙ্গে আরও কিছুদিন আমার থাকা উচিত। সিগারেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত সেই মুহূর্তেই নিয়ে নিলাম।”

– হুমায়ূন আহমেদ।