Tag Archives: বাবাই

বাবাই – দ্বিতীয় খন্ড

চার 

জিনাত পুকুর পাড়ে বসে আসে। এখানে সাধারনত কেউ আসে না। উল্টা পাশে শশ্মান সে জন্য সবাই ভয় পায়। জিনাতের ভয় লাগে না। মন খারাপ হলে জিনাত এখানে এসে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকে না হয় পাশের হিজল গাছটাতে উঠে মনের দুঃখে কাদে।

আজ ওর খুব মনখারাপ। ও আগে কখনো ওর মাকে কাদতে দেখেনি। না ভুল বললাম , এভাবে দেখেনি। মা তো কতই কাদে। মাস দুয়েক আগে যখন ওর বাবার মার খেয়ে জ্বরে মর মর অবস্থা তখন ওর মা পানি ঢেলেই আর কেদেই  সারারাত পার করছে কয়েকদিন। গেল বছর সুপারি গাছে উঠতে যেয়ে যখন গাছ থেকে পরে ডান পা মচকায় যায় ওর মা তখন কেদেকেটে সব একাকার করে দিছিলো একমাত্র ছেলে আর হাটতে পারবে না এই ভয়তে।

জিনাত এসব কথা মনে করে আর চোখ থেকে ফোটায় ফোটায় পানি পড়তে থাকে ওর। ওর মাকে জিনাত খুব ভালোবাসে। এমন মা কি হয় কারো। কিন্তু ওর বাবাকে জিনাত দুচোখে দেখতে পারে না। ও দোয়া করে এমন বাবা যেন কারো না হয়। মনে মনে একশ একটা অভিশাপ দেয় ওর বাবাকে আর ভাবে ওর জন্যই এত কিছু ঘটে ওদের বাড়িতে। আজ ও না থাকলে মা এতো মার খেত না। মাকে এতো কাদতে হতো না। ওর বাবা এমন হিংস্র হতো না। নিজের উপর ঘৃণা ধরে যায় জিনাতের।

পাচ

ক্লাসে আজ মন নেই আজগর আলির। যে কয়টা ক্লাস আজ সে নিছে সব কয়টাতেই কি বলতে কি বলেছে , সব উল্টাপাল্টা। ছাত্রছাত্রীরা যার ক্লাসে মনে মনে ও কথা বলে না তারা আজ মুচকি মুচকি হেসেছে। আজগর আলির ইচ্ছা করছিল কয়েকটাকে আচ্ছা করে ঠেঙ্গাতে। কিন্ত কিছু বললো না। ক্লাস থেকে বের হয়ে এসে কমন রুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে চুপচাপ বসে আসে আর চিন্তা করছে,

যে স্ত্রীকে এতো ভালবেসে বিয়ে করলাম , যার গায়ে কোনদিন ফুলের টোকা ও লাগতে দেইনি আজ তার গায়ে হাত তোললাম আমি। চিন্তা করতে করতে হাপিয়ে উঠে আজগর আলি। কোনভাবেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছে না। কিভাবে পারলো সে এমনটা করতে !

সে ঠিক করলো তার স্ত্রীর কথা ই রাখবে সে। ছেলের গায়ে হাত দিবেনা। মারধোর করবে না। দরকার হলে বুঝিয়ে শুনিয়ে পড়াশোনা যাতে করে সে চেষ্টা করবে। নিশ্চয় জিনাতের মা অনেক খুশি হবে এটা ভাবতে ভাবতে তিনি ছাতা হাতে স্কুল ছুটির আগেই স্কুল থেকে বের হয়ে গেলেন কথাটি জিনাতের মাকে বলার জন্য।

ছয়

জিনাত অস্থির হয়ে কয়েকটা ইট এর কনা জোড়ে পুকুরের পানিতে ছুড়ে মারলো। কোন ভাবেই মনকে শান্ত করতে পারছে না। ওর মাকে আর কষ্ট দিতে চায় না ও।  কিন্তু কিছু ভেবে পায় না জিনাত। ওর দ্বারা এতো এতো বই পড়া সম্ভব না যে পড়াশোনা করে ওর বাবাকে খুশি রাখবে। এর আগেও সে চেষ্টা কম করেনি সে। কিন্তু কোনবারই কোনকিছুতে কিছু হয়নি।

সাত

দুপুর গড়িয়ে গেছে। প্রায় বিকাল হবো হবো অবস্থা। বাড়ির উপর অনেক গাছ থাকায় সরাসরি রোদ এসে ঢুকতে পারে না। তবে পাতার ফাক ফোকর দিয়ে অনেক আলো পাওয়া যায়। এই সময়টাতে আজগর আলি চেয়ারে বসে জিনাতের মা’র রান্না পর্যবেক্ষন করছে। জিনাতের মা আজ এতো খুশি হবে একটামাত্র কথা শুনে আজগর আলি সেটা ভাবতেও পারেনি। সেই খুশিতে তাকে দিয়ে মুরগী ও জবাই করেছে একটা। আজ দুই বাপ ছেলেকে একসাথে বসে খাওয়াবে সেজন্য। আজগর আলি ও খুশি হয়েই জবাই করে দিয়েছে। তার ও মন চাইছে আজ ছেলেটাকে একটু আদর করতে। কাছে বসে খাওয়াতে। কিন্তু সেটা আর লজ্জায় জিনাতের মাকে বলেননি তিনি।

বাবাই – প্রথম খন্ড

এক

আর কোনদিন খেলতে যাবি হারামজাদা? যাবি আর কোনদিন? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। সকাল বেলা ঘুম থেইকা উঠে বাইর হইছস আর এতক্ষনে তোর আসার নাম হইলো। স্কুলে যাস না কয়দিন। তোর বাপের কতবড় জমিদারি রে ! ঘর থেইক্কা লাথথি মাইরা বাইর কইরা দিমুরে। আমারে কইলাম তুই চিনস না।এগুলা বলতে বলতে কাচা বেত দিয়ে সপাং সপাং করে নিজের একমাত্র ছেলেকে পিটাচ্ছে আজগর আলি। এভাবেই প্রতিদিন মার খেয়ে ষোল কলা পূর্ণ করে জিনাত।

এতে অবশ্য জিনাত খুব বেশি অভ্যস্ত তা না। ওর কথা মারলে প্রতিদিন মার। টানা দুই দিন মারবি তারপর ১০ দিন রেস্ট দিয়া যদি কাচা বেতের মাইর আবার দেয় তাইলে কি আর পিঠে সহ্য হয়? হাজার হইলেও তার অভ্যাস এর একটা ব্যাপার আছে।

দুই

পরিবারের একমাত্র সন্তান জিনাত। বয়স ৭। বছর খানেক আগে তার বাবা নিজের প্রাইমারি স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করে দেয়। তিনি সেই প্রাইমারি স্কুলের একজন সিনিয়র শিক্ষক। তার অনেক আশা শিক্ষকের মতো মহান পেশা যার তার ছেলেকে অনেক বড় হতেই হবে। সেজন্য যা করা লাগে তা তিনি গত একবছর ধরে নিয়মিত করে যাচ্ছেন। এলাকায় তার একটা মানসন্মান অনেক বেশি। দূর গায়ের মানুষ ও তার কাছে আসে ২/৪ টা পরামর্শ নিতে।

অপরদিকে জিনাত প্রচন্ড গোয়াড় আর মাথা গরম টাইপের ছেলে। পড়াশোনা করেই না। গত একবছরে হয়তো হাতে গুনে গুনে কিছু ক্লাস সে করছে স্কুলে। সারাদিন মাঠে ঘাটে খেলা, মারামারি এসব ই তার জীবন। সবাই বলে, “যেমনি বাপ তার তেমনি ছেলে”। এলাকায় কোন পোলাপাইন ওর গায়ে হাত দিলে তাকে মেরে মোটামুটি যাতে না চেনা যায় মুখের চেহারা সেরকম করে দেয়। কিন্তু তার বাবা যখন তাকে মারতে মারতে ৮/১০ টা বেত নিমেষেই ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলে তখন তার মুখ থেকে একটা শব্দ ও বের হয় না। নীরবে চোখের পানি ফেলে।

তিন

আগের দিন রাতেও জিনাত প্রচন্ড মার খায়। যেদিন রাতে মার খায় সেদিন রাতে জিনাত আর কিছু মুখে দেয় না। ওভাবেই যেয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে যায়। জিনাতের মা আজগর আলির ভয়ে জিনাতের কাছে যেতে সাহস পায়না। কিন্তু আজগর আলি ঘুমিয়ে গেলে গভীর রাতে ভাত নিয়ে জিনাতের ঘরে যায়। কিন্তু মার খেয়ে জিনাত মরার মতো ঘুমায়। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলার সাধ্য কারো নাই। কাঁদতে কাঁদতে জিনাতের মা তার ঘরে চলে যায়।

সকাল বেলা জানালার পাশে ফিসফিস শব্দ শুনেই জিনাতের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

“এই সিনাত  (জিনাত)এই সিনাত, উঠ উঠ, উত্তর পারাত্তে বাবুইল্লা আইছে, আইজ ৫০ বাজিতে খেলবো। আমি ১০০ ডা মার্বেল আনছি। তাড়াতাড়ি উঠ………….  “

জিনাত উঠে বসে থাকে বিছানায়। ও বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে ফিসফিসানিতে তার ঘুম ভাঙ্গে। সবাই বলে তাকে নাকি হাতি ঘোড়া দিয়ে মাড়ালেও তার ঘুম ভাংগবে না। সবাই অবশ্য তার নামে একটু বেশি বেশিই বলে। যেমনঃ দুদিন আগে শেখের বাগান থেকে খালি আম চুরি করে। বাড়ি এসে শুনে আম আর পুরা দুই গাছ ডাব নাকি ওরা চুরি করছে। শুইনা তো মাথা পুরা বিলা। পরে অবশ্য এটা নিয়ে  কাউকে ঘাটায় নাই। আর এই বেশি বুঝার ব্যাপারটা নিয়েও আর মাথা ঘামায় না সে। যার যা ইচ্ছা বলুক , কম বললেই কি , আর বেশি বললেই কি। মাইর তো সেই সমান।

হঠাৎ করে পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো জিনাতের। আগের দিন দুপুরে যে ভাত খাইছে তারপর আর কিছু খায় নাই সে। তারাতারি করে বিছানা থেকে নামে সে। উঠোন পার হয়ে কল চেপে মুখটা কোনমতে ধুয়েই রান্নাঘরের দিকে হাটা দেয় সে।

কিন্তু রান্না ঘরের কাছে যেতে না যেতেই একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কানে আসে তার। একটু এগিয়ে গিয়ে ঘরের জানালার ফাক দিয়ে তাকাতেই দেখে তার মা মুখে আচল দিয়ে কানতেছে। আর তার বাবাকে বলতেছে, আপনের দোহাই লাগে আমার পোলাডারে আর কোনদিন মাইরেন, আপনার দিলডাত কি কদ্দুর দয়া মায়াও নাই। এইটুকুন একটা পোলা আমার, আপনে মারতে মারতে লাশ বানাই লাইছেন। দশটা না পাচটা একটা মাত্র পোলা আপনের। আজগর আলি জিনাতের মার চুলগুলো মুঠি করে ধরে একটা ঝাকি দিয়ে বললো তুই এইটা নিয়া আর কোন দিন কোন কথা কবি না কইয়া দিলাম। তারপর তিনি হনহন করে দরজা দিয়ে বের হয়ে চলে গেলেন।