Tag Archives: এই রোদ্দুর

এই রোদ্দুর

ছোট বাচ্চা সামলানু যে এত কষ্ট আগে যদি জানতাম তাহলে হয়তো কোনদিন ই বাবা হওয়ার স্বপ্ন ই দেখতাম না। ১০ বছর আগে দোস্তরে স্কাইপে কইতাম না, ইস! আমার যদি একটা পোলা থাকতো।
যাহোক, এই মহা-কর্পোরেট লাইফে এসে একটা ছোটখাট জলজ্যান্ত বিচ্ছু সামলানু যা তা ব্যাপার না। হ্যা, ঠিক ই ধরেছেন, আমার ছেলের কথাই বলছি। সপ্তাহের সাতদিনে বৃহস্পতিবার মানেই আমার ছোটখাট একটা জ্বর আসে। কারন এইদিন সারাদিন আমার কানের কাছে প্যাচাপ্যাচানি চলবে আব্বু কাল কোথায় যাবো? কাল কোথায় যাবো?

তুমি আগের বারের মতো যদি করো না তাইলে কিন্তু এই পরের বার আম্মুর সাথে বের হবো। আচ্ছা কাল চলো না অনেক দূরে যাই।তুমি প্রত্যেকদিন খালি এক পাইছো জঙ্গল। বুড়া-বুড়িরা যায়, ওখানে নিয়ে যাও। আর একটা আছে বাচ্চা পুলা-পাইনের জায়গা। কি যে পাইছো তুমি, আমারে কি বাচ্চা মনে হয় তোমার ? না বুড়া ? আমার দিকে তাকাও না ! সারাদিন খালি এক এই যন্ত্র। তখন আমি মনিটরের স্ক্রীন থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকাই। আর চিন্তা এতো এনার্জি কই থেকে পায় আল্লাহ ! আর অসহায় এর মতো বলি, আচ্ছা আব্বু কাল যেখানে যেতে চাবা সেখানেই নিয়ে যাবো। আব্বু কে একটু কাজ করতে দাও।

আমি জানতাম, তুমি এই কথাটাই বলবা। আগের বার ও ঠিক এটাই বলছিলা। তোমার মনে নাই, আমার মনে আছে। তুমি খালি ফাকি দাও।আগের কোথায় নিয়া গেলা, একটু সময় গেছে আর চলে গেছিলাম। দাড়াও, তুমার কাজের ১২ টা বাজাবো আমি। আমার বুক ধক করে উঠে। আল্লাহ ই জানে কি থেকে কি করে !! চেয়ার থেকে উঠে কোলে নিয়ে, এটা সেটা বলে ঠান্ডা করে ওর মা’র কাছে দিয়ে আসা না পর্যন্ত আমার শান্তি নাই তখন।

আজ শুক্রবার(সকাল-৭টা )

আমার জন্য এইদিনটি একটু আলাদা। অন্যান্যদিন এর তীব্র অফিসিয়াল যন্ত্রনা থেকে আজ একটু ছুটি। তাই বলে যে একটু বেলা করে ঘুমাবো, সেটা আর আমার কপালে থাকে না। প্রতি শুক্রবার পিচ্চি টারে নিয়ে সারা সকাল আমি ঘুরে আসি বাইরে থেকে।

অন্যান্যদিন রোদ্দুর কে ঘুম থেকে তুলে স্কুলে নিয়ে যাই। ঘুমের মধ্যেই ওর মা খাওয়া দাওয়া, প্যান্ট, শার্ট, মোজা-জুতা সবই ঠিক করে দেয়। একই ভাবে চলে স্কুল গেট পর্যন্ত; ঝিমাতে ঝিমাতে।
কিন্তু, শুক্রবার সূর্য কোনদিক দিয়ে উঠে কে জানে। সকাল ৭টার আগেই “আব্বু, এ আব্বু, এই, এই ,এইই ” … এই আম্মু, আব্বুকে তুলো না।

ওর মাকে আর কষ্ট করতে হয় না। চিল্লাচিল্লি তে আমি ই ধরফর করে উঠে পরি। ব্রাশ-ট্রাশ করে রেডি হই বের হবার জন্য। সপ্তাহের এই একদিন রোদ্দুর নিজের হাতে ব্রাশ করে। অন্যসব দিন ই তো ঘুমায়, ব্রাশ করবে কি !! পেস্ট সম্পূর্ন ব্রাশটাতে দিবে। তারপর ঘড়ি ধরে ঠিক ২ মিনিট। যদি বলি এত পেস্ট না দিলেও হয় সাথে সাথে, তুমি আমার থেকে বেশি বুঝো ? আমি টিভিতে দেখি না ২ মিনিট ব্রাশ করতে বলে। তুমি টিভি দেখছো কোনদিন? আমি আর কি !! সাথে সাথে পরাজয় মেনে নিই, নাইলে শুক্রবারেই আমার কপালে শনি নেমে আসবে।

যা হোক , কোনমতে ওকে নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। ঠিক করলাম, বাড়ির পিছনে একটা নদী আছে। ১৫ মিনিট লাগে হেটে যেতে। নদীর ওই পাশে কাশফুল প্রচুর। ওইদিক থেকে হেটে আসবো।
রাস্তায় এত সকালেই মানুষ জন খুব ব্যস্ত ভাবে চলাচল করছে। শুক্রবার দিন কই একটু ফাকা থাকবে। আজ যেন একটু বেশি ই মানুষ! আমরা ২ জন হাত ধরে হেলতে ধুলতে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে কিছু মানুষ দৌড়ের মাঝেই আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।
একটু পথ না যেতেই,
-আব্বু , আব্বু !!
– কি হইছে ?
– হিসু।
– কেবল ই বের হইলাম, এখন ই হিসু ? সারা রাস্তা কি করবি ?
– উফফফফ , খুব বেশি লাগছে (চেহারাটা যদি দেখতেন!!)
– ১৫ সেকেন্ডের মধ্যেই এত হিসু ?

কি আর করা, রাস্তায় দাড়াইয়া ই ছেলে আমার ড্রেনে প্রসাব করতেছে। ফুটপাত দিয়ে লোকজন আসা যাওয়া করতেছে। তার কোন ভাবান্তর নাই। আপন মনে হিসু করতেছে। আর আমি সবাইকে একটা করে সুন্দর হাসি উপহার দিয়ে ই যাচ্ছি …………….

এত সকালে সাধারনত কোন দোকানপাট খুলে না। ছোট ছোট চায়ের দোকান কিছু খুলছে। কিন্তু তেমন ভিড় নাই। মোড় এ যেয়ে দেখি একটা দোকান খুলছে। সাথে সাথে,

আব্বু , আইসক্রিম, আইসক্রিম
কি আইসক্রিম?
ওই যে ওইটা
নাম জানিস না ?
জানি তো, ওই যে ওইটা।
কোনটা?
উফফফ , বললাম না, ওই যে ওইটা।

বুঝলাম, ওর মুখ দিয়ে নাম বের করা আমার কাজ না। দোকানদার কে যেটা চাইলো ওটা দিতে বললাম। পিচ্চি একটা গলি দিয়ে শর্টকাটে নদীর দিকে যাচ্ছি। রোদ্দুর এর বা হাতের কানি আঙ্গুল টা আমি ধরে আছি। আর ও, ডান হাত দিয়ে সমানে আইসক্রিম খেয়ে যাচ্ছে। আইসক্রিম খাওয়ার মধ্যেই কনুই বেয়ে আইসক্রিম এর রস নেমে যাচ্ছে। ওগুলার ও ছাড় নাই। শরীর তিন ব্যাকা করে জিহবা দিয়ে চেটেপুটে খাচ্ছে। তাই দেখে আমি ও হাসতে হাসতে মোটামুটি ব্যাকা হয়ে গেছি। জিজ্ঞাস করলাম কিরে এই খাওয়া কার কাছে শিখসিসি?

– কোন খাওয়া?
– এই যে চেটেপুটে, তোর মার মতো।
– মোটেও বাজে কথা বলবা না।
ওর কথার গাড়ি স্টার্ট হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু থেমে গেল কারন ইতিমধ্যেই আমরা নদীর ধারে চলে এসেছি। সকাল বেলা ঘাস গুলো একেবারে ভেজা ভেজা। জুতা খুলে অনেকক্ষন হাটলাম বাপ-বেটা। তারপর নদীর ওপার যেয়ে কাশফুল এর মধ্যে দিয়ে হাটাহাটি শুরু করলাম ।

আচ্ছা আব্বু এই গাছ গুলা আর বড় হয় না কেন ?
এগুলা গাছ না, গুল্ম টাইপ কিছু একটা।
গুল্ম কি ?
গুল্ম হলো, ঘাস এর মতো। বেশি বড় হয় না এমন উদ্ভিদ।
কিন্তু ঘাস তো অনেক ছোট। এগুলা তো অনেক বড়।
এই হলো বিপদ, কিছু জিজ্ঞাস করা শুরু করলে প্রশ্ন আর থামে না। ওর প্রশ্ন থামানুর জন্য নতুন কায়দা বের করতে হয় তখন। আমি ওকে বললাম তোর দুইহাত দে, তোকে উচু করে একটু ঘুরাই। যে হাত, কোথায় ধরবো এটা নিয়েই বিপদে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত ধরে একটা ঘুরান দিতে পারলাম। সাথে সাথে হাসি কারে কয় !! আব্বু আর একবার, আর একবার।আমি বললাম না বেশি এমন করা ভাল না। না না, আর একবার মাত্র। নিরুপায় হয়ে আর একবার ঘুরান দিলাম। সাথে সাথে, আব্বু আর একবার, আর একবার। আমি ঘড়ির দিকে তাকাইয়া বললাম। অনেক বেজে গেছে আব্বু চলো বাসায় যেতে হবে। বাপজান আমার সাথে সাথে মুখটা পেঁচার মতো করে ফেললো।

http://i.imgur.com/UH9Pb.jpg

বিমর্ষিত হওয়া একটা পিচ্চি নিয়ে নিয়ে চলা যে কি মুশকিল, সেটা নিজে না চললে কেউ বুঝবে না। নদী পার হয়ে হাত ধরে হাটত ছিলাম। হাতটা ছুটাই দিলো প্রথমে। তারপর হয় আমার সামনে হাটবে না হয় পিছে হাটবে এমন শুরু করলো। তারপর, রাস্তা থেকে গাছের ছোট ছোট ডাল গুলা তুলে বিভিন্ন জায়গায় মারতে শুরু করলো। মানা করলে ছোট করে একটা ভেংচি দিয়ে আবার আগের মতো কাজ কারবার শুরু করবে। আমি সম্পূর্ন দিকভান্ত্রের মতো ধীরে ধীরে ওকে নিয়ে যাচ্ছি।

গলিটা পেরিয়ে একটু হেটে রাস্তা পার হতে হবে। তারপর একটা দোকানের পরই আমার বাসাটা। ছোট একটা বাসা, বিয়ের প্রথম থেকেই এখানে আছি আমরা দুজন। দুজন ই আমরা অন্ধকার দেখতেছিলাম যেদিন ডাক্তার প্রথম খারাপ সংবাদ দিলো যে আমরা মা-বাবা হতে পারবো না। কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আজ আমরা বাব- মা হয়েছি। এই ছেলেটাই আমাদের সব। ছোট সংসার টাতে সম্পূর্ন আলোটাই যেন ওর। প্রতিটা মূহুর্ত আজ আমরা ওকে নিয়ে আছি।

এসব ভাবতে ভাবতে একেবারে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলাম। সাথে সাথে দেখলাম, রোদ্দুর দৌড়াতে দৌড়াতে আমার অনেক সামনে চলে গেছে। আমি ডাক দিলাম। আমার ডাক ও মনে হয় শুনতে পেল না। আরো জোড়ে ডাক দিলাম। তারপর দৌড় দিলাম ওকে ধরার জন্য। কিন্তু ধরতে পারলাম না। ও রাস্তার উপর চলে গেছে। আর ঠিক ওপাশেই একটা ট্রাক !!

কি যেন আমার পায়ে বিধল আমি ও খুব জোরে গলির রাস্তাটিতে পরে গেলাম। তারপর সব অন্ধকার !!!!
নিঃছিদ্র অন্ধকার !! আমি হাপাচ্ছি, সারা শরীর ঘামে ভিজে একাকার। দু-চোখ দিয়ে বর্ষার তুমুল বৃষ্টির মতো অজোড়ে পানি ঝরছে। অস্ফুট সুরে বলে উঠলাম, আমার রোদ্দুর কোথায় ?
তারপর নিজেকে আবিস্কার করলাম একটি বদ্ধ ঘরে। আস্তে আস্তে সবকিছু পরিস্কার হলো। মনে মনে এই ভেবে একটু শান্তি পেলাম যে এটা সত্যি নয়।