মানুষ চেনা দায় ?

মানুষ চেনা দায়
কুকুর ডাকে ঘেউ ঘেউ। বিড়ালের ডাক মিউ। গরুর বেলায় এসে তা হয়ে যায় হাম্বা। কোকিলের ডাক কুহু।
ডাক শুনেই যায় চেনা। প্রাণিজগতের প্রতিটি প্রাণীর আলাদা ডাক আছে। যা শুনলে বোঝা যায়, কোন প্রাণী সেটি।
কিন্তু মানুষের ডাক কী? মানুষের কি নির্দিষ্ট কোনো ডাক আছে? যা দিয়ে মানুষ চেনা যাবে। শুনেই বোঝা যাবে, এটা মানুষ।
-নেই। মানুষের নির্দিষ্ট কোনো ডাক নেই। মানুষের ডাক বিভিন্ন।

আবার দেখুন, সবকিছুরই একটা চরিত্র আছে। কুকুর প্রভুভক্ত। গরু গৃহপালিত। বাঘ হিংস্র।
শীতের চরিত্র এক রকম। আবার গরমের চরিত্র আরেক রকম। বর্ষারটাও তার নিজের মতো। কিন্তু তাদের চরিত্র একটাই। সব সময়ই এক। শীতের সময় পত্রিকার পাতায় শীতের অতিথি পাখির ছবি ছাপা হয়। বর্ষায় কদম ফুল। আবার গ্রীষ্মকালে গরম পড়লে চিড়িয়াখানার বাঘের ছবি ছাপা হয় পত্রিকার পাতায়। চিড়িয়াখানার পুকুরে শরীর ডুবিয়ে বসে আছে বাঘ, গরম কাহাকে বলে! গরমের তীব্রতায় বাঘেরও গাত্রদাহ।
মোটামুটিভাবে এই বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই হয়ে আসছে। এসব দেখলে আমাদের কাছে অর্থ পরিষ্কার হয়। আমরা বুঝতে পারি, ঘটনা কী ঘটছে বা ঘটতে যাচ্ছে।
কিন্তু মানুষের চরিত্র কী? মানুষের কি নির্দিষ্ট কোনো চরিত্র আছে?
নেই।
কারণ মানুষ খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী। সৃষ্টি জগতে মানুষই সবার চেয়ে বুদ্ধিমান। আর বুদ্ধির জোরে এই পৃথিবীতে তারাই ক্ষমতাসীন। পৃথিবীতে সরকার গঠন করছে তারা। আর বুদ্ধিমান কিংবা ক্ষমতাসীনেরা সহজে ধরা দেয় না। সহজেই আপনি মানুষ চিনে ফেলবেন, তা তো হতে পারে না। তাই মানুষ চেনার মতো নির্দিষ্ট কোনো আওয়াজ বা ডাক নেই। মানুষের রূপ যেমন বহু, তার প্রকাশভঙ্গিও নানান। মানুষকে নির্দিষ্ট ছকে ফেলা তাই তো রীতিমতো কঠিন কাজ। কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দিয়ে তাকে আটকানো যাবে না। তাই কবির কথাও পরিষ্কার, মানুষ চেনা দায়।
কবিদের কথা কখনোই ফেলনা নয়। বাসি হলেও তা একসময় ফলে। অতীতে এর বহু নজির দেখেছি আমরা। মানুষ সম্পর্কেও কবির কথা ঠিক। মানুষ চেনা জটিল এক বিষয়। অনেক সময় মানুষ নিজেকেই নিজে চিনতে পারে না। নিজেকেই সন্ধান করে ফেরে।
কলেজ-জীবনের ঘটনা। বার্ষিক পিকনিকে গেছি ক্লাসের সবাই দলবেঁধে। সবাই যে যার মতো মজা করছে। হঠাৎ আমাদের ক্লাসের এক মেয়ে গেল পুকুরে পড়ে। গভীর পুকুর। একবার ডুবছে আবার ভেসে উঠছে। এখন-তখন অবস্থা। তুমুল হাউকাউ। পাড়ে বসে সবাই চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। কিন্তু কেউই পুকুরে নামছে না। পানিতে পড়া মেয়েটি বলছে বাঁচাওঃবাঁচাও। পাড়ে যারা আছে তারাও বলছে বাঁচাওঃবাঁচাও। অদ্ভুত কাণ্ড।
হঠাৎ আমাদের বন্ধু আশরাফ ঝাঁপিয়ে পড়ল পুকুরে। উদ্ধার করে আনল মেয়েটিকে। সবাই হাততালি দিল। চোখের সামনে হিরো হয়ে গেল আশরাফ।
সেই থেকে আশরাফের নাম হয়ে গেল উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা। তারপর আমাদের আশরাফ ওরফে হামজাকে সেই মেয়েটি প্রাণ-মন, সব দিয়ে দিল। তাদের মধ্যে ‘ইয়ে’ হয়ে গেল। তারপর বিয়েও হলো। ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’।
গল্পটি এমন হলে ভালোই হতো। কিন্তু তা হয়নি। নয় বছর প্রেম করে বিয়ে করা তাদের সংসার নয় মাসও টেকেনি। উদ্ধারকারী হামজা মানে আমাদের আশরাফের ওপর নির্ভর করতে পারেনি মেয়েটি। অন্যদিকে আমাদের আশরাফের বক্তব্য ছিল, মেয়েটিকে চিনতে পারেনি সে। মাঝের নয় বছর তাহলে তারা কী করল? পার্কে বসে অন্তত কয়েক মণ বাদাম চিবিয়ে কিসের সন্ধান করল তারা!
নয় বছর প্রেম করেও একজন আরেকজনকে চিনছে না। একই অবস্থা বিবাহের পঞ্চাশ বছর পার করা দম্পতিদের বেলায়ও দেখা যায়। এত দিন পরও একজনের কাছে অন্যজন অচেনাই থেকে যায়। মানুষ চেনার বেলায় দুয়ে দুয়ে চার হয় না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই।
আমাদের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন, যারা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার মতো। তারা সব সময় অন্যের উপকার করেন। পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি ধরনের। কিন্তু এই ধরনের মানুষের সংখ্যা হাতেগোনা। মানুষের মধ্যে এরা বিলুপ্ত প্রজাতির। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের জন্য যেমন অভয়ারণ্য তৈরি করা হয়, এই ধরনের মানুষের জন্যও অভয়ারণ্য জরুরি।
অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষই অন্যের কাছ থেকে শুধু নিতে ভালোবাসেন। অন্যকে যে কিছু দিতেও হয়, বিষয়টি তাদের মাথায় থাকে না। শুধু নেওয়াতেই তাদের সব সুখ।
প্রাণিকুলের মধ্যে মানুষই খুব অল্প সময়ের মধ্যে তার রূপ বদলাতে পারে। রেকর্ড সময়ের মধ্যে বদলে যায় মানুষ। একটু আগেও যে ছিল হাবাগোবা ধরনের, সে হয়ে যায় ধূর্ত। মিষ্টি হাসির মানুষটির চেহারায় ফুটে ওঠে হিংস্রতা। আর এ জন্যই প্রাণীদের মধ্যে শুধু মানুষকেই বারবার আয়না দেখতে হয়। অন্য প্রাণীরা কিন্তু আয়না দেখে না। প্রতিনিয়ত রূপ বদলায় বলে তাদের আয়না দেখতে হয় চেহারা মনে রাখার জন্য। নাহলে হয়তো সে নিজেকেই নিজে চিনবে না।
আবার একমাত্র মানুষই রূপ বদলাতে মেকআপ করে। বদলে ফেলে নিজেকে। মানুষ বদলাতে ভালোবাসে। এক খোলসের ভেতর থাকা তাদের অপছন্দ। তাই প্রতিনিয়ত বদলায় মানুষ, মানে আমরা।
সে রকমই এক লোক সিদ্ধান্ত নিল বদলে ফেলবে নিজেকে। প্লাস্টিক সার্জারি করাবে। গেল ডাক্তারের কাছে।
ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল, কত খরচ পড়বে প্লাস্টিক সার্জারি করাতে?
ডাক্তার বললেন, দুই লাখ টাকা।
আর যদি প্লাস্টিক আমি দিই, তাহলে কত লাগবে?
সোজাসাপটা জানতে চাইল লোকটি!
মানুষ স্বার্থান্বেষী। মানুষ ছিদ্রান্বেষী। নিজের স্বার্থ যেদিকে মানুষ সেদিকে। স্বার্থের বিরুদ্ধে এক ইঞ্চিও সরানো যাবে না তাদের। বুলডোজার দিয়েও না। স্বার্থই তাদের সবচেয়ে বড় আপনজন। এ বিষয়ে তাদের ক্ষমতা অবাক করার মতো।
এক সৈনিক যাচ্ছে যুদ্ধে।
বিদায়বেলায় তার স্ত্রী এসে জিজ্ঞেস করল, এই, তুমি কত দিনের জন্য যুদ্ধে যাচ্ছ গো?
স্বামী বলল: এক মাসের জন্য।
স্ত্রী বলল: তুমি এক মাসের আগে এসে আবার আমাকে অবাক করে দেওয়ার চেষ্টা করো না। তাহলে কিন্তু তুমি নিজেই অবাক হয়ে যাবে!
মানুষ এমনই। যত তাদের কাছাকাছি যাওয়া যায়, ততই অবাক হতে হয়। খুব কাছের মানুষকেও মনে হয় অনেক অচেনা। আবার দূরের মানুষকেও মাঝে মাঝে খুব কাছের মনে হয়। ভালো মানুষের ভাব ধরে থাকা লোকটাও যে কত খারাপ হতে পারে, তা চিন্তাও করা যায় না। মুখে এক, মনে আরেক। এ শুধু মানুষের পক্ষেই সম্ভব।”

Leave a Reply