Fav Writings

সফো এবং আমাদের চিত্র-বিচিত্র, কারুশিল্প কাহিনী

জনমেজয় কহিলেন, ‘মহর্ষে, আপনি কহিলেন বিংশ শতকের অন্তিম ভাগে সফটওয়্যার ইঞ্জিনীয়ার নামক এক অদ্ভুত জীবের প্রাদুর্ভাব হইবে। ইহারা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কী করিবে তা জানিতে বড় কৌতূহল জন্মাইতেছে।’
বৈশম্পায়ন কহিলেন, ‘হে নরবর, আমি এক্ষণে সেই বিচিত্রবুদ্ধি, স্বার্থপর, পলায়নকুশলী সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনীয়ারদের আখ্যাত করিব। আপনি শ্রবণ করুন। বর্ণনার সুবিধার্থে আমি ইহাদের এক্ষণ হইতে সফো বলিয়াই উল্লেখ করিব।’
‘যাহারা কর্মক্ষেত্রে প্রভাতে কফি পান করিবে, অপরাহ্নে চ্যাট করিবে এবং সায়াহ্নে ঊর্দ্ধতনকে গালিদানপূর্বক আপনার কর্ম সম্পাদন করিবে, তাহারাই সফো। যাহারা শৈশব কনভেন্ট স্কুলে, যৌবন ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে এবং অকালবার্ধক্য আপিসে অতিবাহিত করিবে, তাহারাই সফো।’
‘কর্মক্ষেত্রে ইহাদের প্রভুরা ইহাদিগকে পিঞ্জরসদৃশ স্থানে বন্দী করিয়া রাখিবেন। সেই স্থানের নাম হইবে কিউবিকল। সফোরা সেই কিউবিকলের মধ্যে আপন আপন কেদারায় বসিয়া মেদিনী জয় করিবে এবং মেদিনীপুরের পুলিশি অত্যাচার লইয়া অন্য সফোর সঙ্গে দীর্ঘ দূরভাষ-আলাপ চালাইবে।’
‘হে নরেন্দ্র! আরও শ্রবণ করুন। যাহারা প্রেয়সীর সম্মুখে প্রভুর মস্তক চর্বণ করিবে, প্রভুর সম্মুখে সহকর্মীর মস্তক চর্বণ করিবে এবং সহকর্মীর সম্মুখে প্রেয়সীর মস্তক চর্বণ করিবে তাহারাই সফো। যাহাদের দৃষ্টি দিনান্তে আপনার পর্বতপ্রমাণ অকৃতকার্যে, মাসান্তে স্যালারি স্লিপে এবং বৎসরান্তে প্রতিদ্বন্ধী কোম্পানীর ভ্যাকান্সীতে হইবে, তাহারাই সফো।’
‘মহাদেবের ন্যায় ইহাদেরও দুই বিশ্বস্ত সহচর থাকিবে। প্রথমটির নাম বাগ এবং দ্বিতীয়টির নাম ইস্যু। সফোরা ব্রহ্মার ন্যায় বাগ এবং ইস্যুর জন্মদানের মাধ্যমে আপন আপন কর্মপন্ডের নিত্যনতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিবে এবং আপনার ঊর্দ্ধতনের প্রিয়পাষণ হইয়া উঠিবে। বিষ্ণুর ন্যায় ইহাদিগেরও দশ অবতার থাকিবে। যথা ট্রেনী, বেঞ্চার, ডেভেলপার, প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট, মডিউল লিডার, প্রোজেক্ট লিডার, প্রোজেক্ট ম্যানেজার, সিনিয়ার প্রোজেক্ট ম্যানেজার, জেনারেল প্রোজেক্ট ম্যানেজার এবং ডেলিভারী ম্যানেজার। প্রত্যেক সফোই এই দশটি অবতারে অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ পাইবে। কিন্তু প্রত্যেক অবতারেই ইহারা আগের অবতার জন্ম সম্পর্কে বিস্মৃত থাকিবে এবং ডারউইন নামক এক সত্যদ্রষ্টার গণনা অনুসারে প্রত্যেক অবতারেই ইহারা তাহার আগের অবতারে অবতীর্ণ নিম্নতন সফোকে বধ করিবে।’

‘হে রাজন্! যাহাদের কর্ম কম্পিউটারে, ধর্ম প্রোগ্রামে এবং অর্থ ক্রেডিট কার্ডে তাহারাই সফো। ইহাদের কম্পিটারে শত জিবি সঙ্গীত, প্রোগ্রামে অসংখ্য ভ্রান্তি এবং ক্রেডিট কার্ডে অপরিমেয় ঋণ থাকিবে। ফলস্বরূপ ইহারা ঊর্ধ্বতনের নিকট গালি এবং বান্ধবীর নিকট অর্ধচন্দ্র খাইবে। যাহাদের শক্তি কন্ট্রোল সি- কন্ট্রোল ভি’তে, বুদ্ধি গুগল সার্চে এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ মিনি স্কার্টে, তাহারাই সফো। ইহাদের অঙ্গুলি দুটি বিশেষ ইংরাজী বর্ণের প্রতি বিশেষভাবে দূর্বল হইবে। সেই কারণে ইহাদের কীবোর্ডে সি ও ভি চাবি দুটি প্রায় বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। ইন্টারনেট নামক এক অসাধারণ অস্ত্রের সহায়তায় চুরি এবং নকল জাতীয় শব্দকে ইহারা লজ্জা দিবেন এবং কোড মডিফিকেশান নামক এক নতুন শব্দকে আপ্তবাক্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা করিবেন।’
‘যাহারা কর্মে মনোমধ্যে এক, প্রোগ্রামিং-এ অর্ধেক, একজিকিউশানে এক-চতুর্থাংশ এবং ডেলিভারীতে অদৃশ্য, তাহারাই সফো। যাহারা বাক্যে আপনার কিউবিকলে এক, ঊর্ধ্বতনের সম্মুখে দশ, ক্লায়েন্ট মিটিং-এ শত এবং প্রোজেক্ট পার্টিতে সহস্র, তাহারাই সফো। যাহারা নিজেদের ঊর্ধ্বতনের নিকট পন্ডিত, ক্লায়েন্টের নিকট দিগ্গজ এবং বান্ধবীর নিকট সফট্ওয়্যার বিধাতা প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা করিবে, তাহারাই সফো।’
‘সফোদের বিদেশযাত্রা ঘটিবে এবং সেই বিপর্যয়ের নাম রাখা হইবে অনসাইট গমন। অনসাইটে থাকিয়া সফোরা অ্যালায়েন্সের নামে কোম্পানীর ভান্ডার লুটিতে থাকিবে এবং পূর্বকথিত বাগের সাহায্যে ক্লায়েন্টের শিরঃপীড়ার কারণ হইয়া দাঁড়াইবে। লক্ষ্মীদেবীর অকৃপণ সহযোগিতায় ইহারা অর্থ উপার্জন করিবে, কিন্তু মহাদেবের বরে সে সকল অর্থ বিদেশী সুরায় রূপান্তরিত হইয়া বহিতে থাকিবে। ফলস্বরূপ দেশে প্রত্যাবর্তনের পর ইহাদের নিকটাত্মীয়রা আবিষ্কার করিবেন যে, প্রকৃতপক্ষে ইহারা অর্থ অপেক্ষা অধিক ওজন উপার্জন করিয়া ফিরিয়াছে।’

‘মহারাজ, যাহাদের আসক্তি আহারগ্রহণের সময় পিজ্জায়, সম্বোধনের সময় আমেরিকান শব্দাবলীতে এবং সংকট মূহুর্তে সিগারেটে হইবে, তাহারাই সফো। যাহারা বন্ধুবর্গকে দেখিয়া ডিউড, প্রেয়সীকে দেখিয়া সেক্সি এবং ম্যানেজারকে দেখিয়া শিট বলিবে, তাহারাই নিশ্চিতরূপে সফো।’
‘ইহাদের সময়জ্ঞান অত্যন্ত শোচনীয় হইবে। ইহাদের ঊর্ধ্বতন ডেডলাইন বলিয়া একটি বিবর্ধনযন্ত্র আমদানি করিবেন। সেই যন্ত্রে সফোরা দিনকে সপ্তাহ, সপ্তাহকে মাস এবং মাসকে বৎসর হিসাবে গণ্য করিবে। ডেডলাইনের সহিত তাল মিলাইতে নিজেদের কর্ম সম্পাদনের সময় উল্লেখ করিয়া সফোরা অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট নামক একটি প্রহসন রচনা করিতে থাকিবে। ইহাতে উল্লেখিত কর্ম সময় যেগ করিলে সফোদের বয়সের দ্বিগুণ হইয়া যাইবে।’
‘হে নরবর, যাহারা বান্ধবীর সান্নিধ্যে মহব্বতেঁ, বান্ধবের সান্নিধ্যে হে বেবী এবং কোম্পানীর প্রদত্ত ল্যাপটপে পর্ণো দেখিয়া মনোরঞ্জন করিবে, তাহারাই সফো। ইহারা অবসরে পিতামাতার সহিত বিড়লা মন্দিরে, বান্ধবীর সহিত মকবুল ফিদার প্রদর্শনীতে এবং বান্ধবের সহিত প্যান্টালুন্স-এর সেলে যাইবে।’

জনমেজয় কহিলেন, ‘মহর্ষে, আপনি এতক্ষণ যা শোনাইলেন, তা কেবল পুরুষ সফোদের উদ্দেশ্য করিল। সফোদের কী স্ত্রী লিঙ্গ হইব না? হইলে তাহারা কীরূপ হইবে তা জানিতে ইচ্ছা করি।’
বৈশম্পায়ন মৃদু হাসিয়া কহিলেন, ‘হে রাজন্, ইতিমধ্যে যা আখ্যাত করিলাম, তা সফোদের উভয় লিঙ্গের জন্যেই সমান প্রযোজ্য হইবে। কিন্তু বিশেষতঃ স্ত্রী সফোদের কর্মকান্ড কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ সফোদের ছাড়াইয়া কয়েক ক্রোশ অগ্রবর্তী হইবে। ইহারা কর্মক্ষেত্রে ফর্মাল ওয়্যার বলিতে মিনিস্কার্ট, কর্মী বলিতে পুরুষ এবং কর্ম বলিতে বান্ধবীর সহিত দূরভাষে সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র সমালোচনা গণ্য করিবে। ইহাদের নাসাগ্র মাথার একফুট উপরে উত্থিত থাকিবে এবং মেজাজ বসিয়া কর্মে ত্রুটি দেখিলেই সংজ্ঞা হারাইবে এবং নিজের ক্ষেত্রে সেই একই ত্রুটি যাতে না ঘটিতে পারে, সেইজন্য সতর্কতা স্বরূপ ইহারা কর্মে হাত লাগাইবে না।’
‘স্ত্রী সফোরা দিনান্তে কোম্পানী-বাসের আসন, সপ্তাহান্তে চলচ্চিত্রগৃহের আসন এবং কর্মক্ষেত্রের জনসংযগের আসন অধিকার করিয়া পুরুষ সফোদের ধন্য করিবে। এক্ষেত্রে চন্ডীর সহিত ইহাদের দারুণ সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হইবে। কর্মক্ষেত্রে রণচন্ডী হইয়া সমগ্র সফট্ওয়্যার জগতকে পুরুষ সফোদের হাত হইতে রক্ষা করিবে।’
জনমেজয় কহিলেন, ‘হে মুনিবর, সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনীয়ারদের জয় হউক। আপনি অন্য প্রসঙ্গ আরম্ভ করুন।’

[পাদটীকা : সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনীয়ারের হাত থেকে বঙ্কিমচন্দ্রও রক্ষা পেলেন না। কন্ট্রোল এ- কন্ট্রোল সি- কন্ট্রোল ভি।]

কপিরাইটঃ রোহান কুদ্দুস

You may also like
মন ঠিক জানে তুমি কী হতে চাও : স্টিভ জবস
নিরন্তন সফটওয়্যার ভাবনা

Leave a Reply