বাবাই – প্রথম খন্ড

এক

আর কোনদিন খেলতে যাবি হারামজাদা? যাবি আর কোনদিন? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। সকাল বেলা ঘুম থেইকা উঠে বাইর হইছস আর এতক্ষনে তোর আসার নাম হইলো। স্কুলে যাস না কয়দিন। তোর বাপের কতবড় জমিদারি রে ! ঘর থেইক্কা লাথথি মাইরা বাইর কইরা দিমুরে। আমারে কইলাম তুই চিনস না।এগুলা বলতে বলতে কাচা বেত দিয়ে সপাং সপাং করে নিজের একমাত্র ছেলেকে পিটাচ্ছে আজগর আলি। এভাবেই প্রতিদিন মার খেয়ে ষোল কলা পূর্ণ করে জিনাত।

এতে অবশ্য জিনাত খুব বেশি অভ্যস্ত তা না। ওর কথা মারলে প্রতিদিন মার। টানা দুই দিন মারবি তারপর ১০ দিন রেস্ট দিয়া যদি কাচা বেতের মাইর আবার দেয় তাইলে কি আর পিঠে সহ্য হয়? হাজার হইলেও তার অভ্যাস এর একটা ব্যাপার আছে।

দুই

পরিবারের একমাত্র সন্তান জিনাত। বয়স ৭। বছর খানেক আগে তার বাবা নিজের প্রাইমারি স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করে দেয়। তিনি সেই প্রাইমারি স্কুলের একজন সিনিয়র শিক্ষক। তার অনেক আশা শিক্ষকের মতো মহান পেশা যার তার ছেলেকে অনেক বড় হতেই হবে। সেজন্য যা করা লাগে তা তিনি গত একবছর ধরে নিয়মিত করে যাচ্ছেন। এলাকায় তার একটা মানসন্মান অনেক বেশি। দূর গায়ের মানুষ ও তার কাছে আসে ২/৪ টা পরামর্শ নিতে।

অপরদিকে জিনাত প্রচন্ড গোয়াড় আর মাথা গরম টাইপের ছেলে। পড়াশোনা করেই না। গত একবছরে হয়তো হাতে গুনে গুনে কিছু ক্লাস সে করছে স্কুলে। সারাদিন মাঠে ঘাটে খেলা, মারামারি এসব ই তার জীবন। সবাই বলে, “যেমনি বাপ তার তেমনি ছেলে”। এলাকায় কোন পোলাপাইন ওর গায়ে হাত দিলে তাকে মেরে মোটামুটি যাতে না চেনা যায় মুখের চেহারা সেরকম করে দেয়। কিন্তু তার বাবা যখন তাকে মারতে মারতে ৮/১০ টা বেত নিমেষেই ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলে তখন তার মুখ থেকে একটা শব্দ ও বের হয় না। নীরবে চোখের পানি ফেলে।

তিন

আগের দিন রাতেও জিনাত প্রচন্ড মার খায়। যেদিন রাতে মার খায় সেদিন রাতে জিনাত আর কিছু মুখে দেয় না। ওভাবেই যেয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে যায়। জিনাতের মা আজগর আলির ভয়ে জিনাতের কাছে যেতে সাহস পায়না। কিন্তু আজগর আলি ঘুমিয়ে গেলে গভীর রাতে ভাত নিয়ে জিনাতের ঘরে যায়। কিন্তু মার খেয়ে জিনাত মরার মতো ঘুমায়। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলার সাধ্য কারো নাই। কাঁদতে কাঁদতে জিনাতের মা তার ঘরে চলে যায়।

সকাল বেলা জানালার পাশে ফিসফিস শব্দ শুনেই জিনাতের ঘুম ভেঙ্গে গেল।

“এই সিনাত  (জিনাত)এই সিনাত, উঠ উঠ, উত্তর পারাত্তে বাবুইল্লা আইছে, আইজ ৫০ বাজিতে খেলবো। আমি ১০০ ডা মার্বেল আনছি। তাড়াতাড়ি উঠ………….  “

জিনাত উঠে বসে থাকে বিছানায়। ও বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে ফিসফিসানিতে তার ঘুম ভাঙ্গে। সবাই বলে তাকে নাকি হাতি ঘোড়া দিয়ে মাড়ালেও তার ঘুম ভাংগবে না। সবাই অবশ্য তার নামে একটু বেশি বেশিই বলে। যেমনঃ দুদিন আগে শেখের বাগান থেকে খালি আম চুরি করে। বাড়ি এসে শুনে আম আর পুরা দুই গাছ ডাব নাকি ওরা চুরি করছে। শুইনা তো মাথা পুরা বিলা। পরে অবশ্য এটা নিয়ে  কাউকে ঘাটায় নাই। আর এই বেশি বুঝার ব্যাপারটা নিয়েও আর মাথা ঘামায় না সে। যার যা ইচ্ছা বলুক , কম বললেই কি , আর বেশি বললেই কি। মাইর তো সেই সমান।

হঠাৎ করে পেটে মোচড় দিয়ে উঠলো জিনাতের। আগের দিন দুপুরে যে ভাত খাইছে তারপর আর কিছু খায় নাই সে। তারাতারি করে বিছানা থেকে নামে সে। উঠোন পার হয়ে কল চেপে মুখটা কোনমতে ধুয়েই রান্নাঘরের দিকে হাটা দেয় সে।

কিন্তু রান্না ঘরের কাছে যেতে না যেতেই একটা চাপা কান্নার আওয়াজ কানে আসে তার। একটু এগিয়ে গিয়ে ঘরের জানালার ফাক দিয়ে তাকাতেই দেখে তার মা মুখে আচল দিয়ে কানতেছে। আর তার বাবাকে বলতেছে, আপনের দোহাই লাগে আমার পোলাডারে আর কোনদিন মাইরেন, আপনার দিলডাত কি কদ্দুর দয়া মায়াও নাই। এইটুকুন একটা পোলা আমার, আপনে মারতে মারতে লাশ বানাই লাইছেন। দশটা না পাচটা একটা মাত্র পোলা আপনের। আজগর আলি জিনাতের মার চুলগুলো মুঠি করে ধরে একটা ঝাকি দিয়ে বললো তুই এইটা নিয়া আর কোন দিন কোন কথা কবি না কইয়া দিলাম। তারপর তিনি হনহন করে দরজা দিয়ে বের হয়ে চলে গেলেন।

 

4 comments

    1. একটু প্রচার বিমুখ (ভাব’স 😛 )
      বেশি ভালা লাগলে লিঙ্ক ফেবুতে শেয়ার করতে পারেন। হা হা :)

Leave a Reply